খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের জনপ্রিয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য নাম আজম খান। তিনি শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পীই নন, ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র হাতে যেমন লড়েছেন, তেমনি স্বাধীনতার পর গান দিয়ে জয় করেছেন কোটি মানুষের হৃদয়। তাঁকেই যথার্থ অর্থে বাংলাদেশের পপ ও ব্যান্ড সঙ্গীতের অগ্রদূত, পথপ্রদর্শক এবং ‘গুরু’ বলা হয়।
তাঁর পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। বাংলা গানের আকাশে তিনি অমর হয়ে আছেন তাঁর কালজয়ী গানগুলোর মাধ্যমে— রেল লাইনের ঐ বস্তিতে, ওরে সালেকা ওরে মালেকা, আলাল ও দুলাল, অনামিকা, অভিমানী, আসি আসি বলেসহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানে।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর প্রথম কনসার্ট প্রচারিত হয়, যা দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন আজম খান। তাঁর পিতা মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন খান ছিলেন সচিবালয়ের হোম ডিপার্টমেন্টের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং ব্যক্তিগতভাবে একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। মাতা ছিলেন জোবেদা খাতুন।
তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তাঁর বড় ভাই সাইদ খান, মেজ ভাই প্রখ্যাত সুরকার আলম খান, ছোট ভাই লিয়াকত আলী খান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এবং ছোট বোন শামীমা আক্তার খানম।
শিক্ষাজীবন শুরু হয় আজিমপুর ঢাকেশ্বরী স্কুলে। পরে কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৮ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭০ সালে টি অ্যান্ড টি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। মুক্তিযুদ্ধের কারণে এরপর আর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন এগোয়নি।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’র সক্রিয় সদস্য হিসেবে গণসঙ্গীত গেয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাবার অনুপ্রেরণায় যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে পৌঁছে যান ভারতের আগরতলায়। লক্ষ্য ছিল সেক্টর-২-এ কর্নেল খালেদ মোশাররফের অধীনে যুদ্ধ করা।
মেলাঘর প্রশিক্ষণ শিবিরে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর তিনি কুমিল্লার সালদায় প্রথম সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। পরে তাঁকে পাঠানো হয় ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য।
মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সাহসী গেরিলা যোদ্ধা। সেক্টর-২-এর একটি সেকশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার হিসেবে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় একাধিক গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেন।
তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘অপারেশন তিতাস’ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও হোটেল পূর্বাণীর গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা, যাতে বিদেশিরা বুঝতে পারে—বাংলাদেশে ভয়াবহ এক মুক্তিযুদ্ধ চলছে।
যুদ্ধ চলাকালে তিনি বাম কানে গুরুতর আঘাত পান, যা পরবর্তীকালে তাঁর শ্রবণশক্তির ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু সেই আঘাতও তাঁর মনোবলকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেন। এর আগে মাদারটেকের ত্রিমোহনী যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করার গৌরবও অর্জন করেন।
পরিবার ও ব্যক্তিজীবন
ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী শাহেদা বেগমের সঙ্গে সুখী সংসার গড়ে তুলেছিলেন আজম খান। তাঁদের পরিবারে রয়েছে তিন সন্তান—ইমা, হৃদয় ও অরণী।
বাংলাদেশের এই কিংবদন্তি শিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করার পর ২০১১ সালের ৫ জুন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মরণোত্তর তিনি একুশে পদক লাভ করেন। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননাই তাঁর প্রকৃত অবদানকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। কারণ তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের স্পন্দন, স্বাধীনতার চেতনার কণ্ঠস্বর এবং বাংলা পপ সঙ্গীতের অবিসংবাদিত সম্রাট।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই মহান মুক্তিযোদ্ধা ও সঙ্গীত কিংবদন্তিকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, আজম খান।
তুমি নেই, কিন্তু তোমার গান আছে।
তোমার কণ্ঠ আছে।
তোমার মুক্তিযুদ্ধের সাহসিকতা আছে।
আর আছে কোটি মানুষের হৃদয়ে তোমার অমলিন উপস্থিতি।
গুরু, তোমায় বিউগল স্যালুট।