খুলনা নগরের সোনাডাঙ্গা এলাকার বহুল আলোচিত নানি ও দুই নাতি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর মামলার প্রধান আসামি রফিকুল ইসলাম হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। বৃহস্পতিবার রাতে বরিশাল নগরের কাশীপুর এলাকায় পরিচালিত যৌথ অভিযানে তাঁকে আটক করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই গ্রেপ্তার আলোচিত তিন হত্যার ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
র্যাব-৬ সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব-৬ সদর কোম্পানি এবং র্যাব-৮-এর সদস্যরা যৌথভাবে বরিশাল কোতোয়ালি থানার কাশীপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে খুলনার সোনাডাঙ্গা থানায় দায়ের করা ট্রিপল মার্ডার মামলার প্রধান আসামি রফিকুল ইসলাম হাওলাদারকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁকে সোনাডাঙ্গা থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
গত ৩০ মে খুলনা নগরের তমিজউদ্দিন সড়কের দারুস আমান মহল্লার একটি ভাড়া বাসা থেকে একই পরিবারের তিন সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন বেবি বেগম (৫৫), তাঁর নাতি শামীম ব্যাপারী (১৩) এবং মুস্তাকিম (৪)। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দেয়।
প্রাথমিক তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পারে, বেবি বেগমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে দুই শিশু শামীম ও মুস্তাকিমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। একই পরিবারের তিন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা নগরজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
নিহতদের পরিচয় ও প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য
নাম
বয়স
সম্পর্ক
প্রাথমিকভাবে ধারণাকৃত মৃত্যুর কারণ
বেবি বেগম
৫৫
নানি
ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা
শামীম ব্যাপারী
১৩
নাতি
শ্বাসরোধে হত্যা
মুস্তাকিম
৪
নাতি
শ্বাসরোধে হত্যা
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকেলের দিকে বাসার একটি কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। পরে তারা বিষয়টি পুলিশকে জানায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রথমে একটি কক্ষ থেকে বেবি বেগম ও শামীমের মরদেহ উদ্ধার করে। এ সময় চার বছর বয়সী মুস্তাকিমকে খুঁজে পাওয়া না যাওয়ায় তাঁকে নিখোঁজ বলে মনে করা হয়েছিল। পরে ঘরের ভেতরে থাকা একটি ওয়ার্ডরোবের তালা ভেঙে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই দৃশ্য উপস্থিত পুলিশ সদস্য ও স্থানীয়দেরও হতবাক করে।
ঘটনার পরপরই গোয়েন্দা পুলিশ এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগারে পাঠান। তদন্তকারীরা হত্যাকাণ্ডের সময়কাল, হত্যার পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে কাজ শুরু করেন।
পরদিন নিহত দুই শিশুর বাবা মাসুম ব্যাপারী সোনাডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় চার বছর আগে পারিবারিক কলহের কারণে তাঁর প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগমের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পরবর্তীতে ফাতেমা বেগম রফিকুল ইসলাম হাওলাদারকে বিয়ে করেন।
মামলার নথি ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ফাতেমা বেগমের মা বেবি বেগম এই বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলছিল। অভিযোগ রয়েছে, বেবি বেগম রফিকুল ইসলামকে বাড়িতে যাতায়াত করতেও নিষেধ করেছিলেন। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, এই দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক দ্বন্দ্ব হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। তবে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২৯ মে রাত থেকে ৩০ মে ভোরের মধ্যে কোনো এক সময়ে রফিকুল ইসলাম অজ্ঞাতনামা কয়েকজন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে বেবি বেগম ও তাঁর দুই নাতিকে হত্যা করে পালিয়ে যান। প্রধান আসামির গ্রেপ্তারের পর এখন তাঁর জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য, সম্ভাব্য সহযোগীদের পরিচয় এবং হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য উদ্ঘাটনের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তদন্তকারীরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, রফিকুল ইসলামের গ্রেপ্তার মামলার তদন্তে একটি বড় অগ্রগতি। তাঁর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, পরিকল্পনাটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল এবং ঘটনার পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব বিষয় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। ফলে খুলনার এই আলোচিত ট্রিপল মার্ডার মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।