খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র রূপ নেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। ইসরাইলের নতুন সামরিক পদক্ষেপ এবং ইরানের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের খবরের পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের উদ্বেগে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (৮ জুন) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের প্রধান দুটি মানদণ্ড—ব্রেন্ট ক্রুড এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই (ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট)—উভয়ের দামই ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলারের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সোমবারের বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রতি ব্যারেলে ৩.২০ ডলার বা ৩.৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৬.২৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে মার্কিন ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ২.৮৭ ডলার বা ৩.১৭ শতাংশ বেড়ে ৯৩.৪১ ডলারে এসে ঠেকেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির তুলনামূলক চিত্রটি নিচে টেবিলের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হলো:
| তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড | পরিবর্তনের আগের মূল্য (ডলার/ব্যারেল) | পরিবর্তনের পরের মূল্য (ডলার/ব্যারেল) | নিট মূল্যবৃদ্ধি (ব্যারেলপ্রতি ডলার) | শতাংশের হিসাবে বৃদ্ধি |
| ব্রেন্ট ক্রুড | ৯৩.০৪ | ৯৬.২৪ | ৩.২০ | ৩.৩৯% |
| মার্কিন ডব্লিউটিআই | ৯০.৫৪ | ৯৩.৪১ | ২.৮৭ | ৩.১৭% |
এর আগে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমনের ইঙ্গিত পাওয়ায় গত শুক্রবার তেলের বাজার কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছিল। তবে সামগ্রিক দীর্ঘমেয়াদি বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু করে জুনের এই বর্তমান সময় পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামগ্রিকভাবে ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।
সোমবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরান, তাবরিজ এবং ইসফাহান শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত অবসান হওয়ার সম্ভাবনাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বের মোট উৎপাদিত খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ পরিবহনের একমাত্র প্রধান সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আশাও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। এই আন্তর্জাতিক নৌরুটটি বন্ধ বা বিঘ্নিত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার আরও বিপর্যস্ত হতে পারে।
যদিও গত রবিবার ইরান সরাসরি ইসরাইলের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল, তা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে একটি বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে পারস্পরিক চুক্তি এখনো সম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নতুন কোনো পাল্টা হামলা বা সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন।
অন্য দিকে, লেবাননে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছে ইরান। গত মার্চ মাসে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে ইসরাইল লেবাননের অভ্যন্তরে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। পরবর্তীতে ওয়াশিংটনে দীর্ঘ আলোচনার পর গত ৩ জুন উভয় দেশ একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে পেরেছিল।
বৈশ্বিক বাজারে উদ্ভূত এই সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলা করার লক্ষ্যে গত রবিবার তেল উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর বৃহৎ জোট ‘ওপেক প্লাস’ টানা চতুর্থবারের মতো তাদের তেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির বর্তমান অচলাবস্থা এবং বিভিন্ন উৎপাদনকারী দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে এই সিদ্ধান্তের বাস্তব সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিস্টাড এনার্জি’-র ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান জর্জ লিওন বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম অস্থিরতার মুখে ওপেক প্লাসের তেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব প্রকৃতপক্ষে শূন্যের কাছাকাছি।