খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
মূল ভাবনা: নঈম নিজাম
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় ও প্রভাবশালী পুরুষ সিরাজুল আলম খান (দাদা ভাই)—রাজনীতির মাঠের ভিন্ন মেরুর দুই মানুষ, অথচ তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বন্ধনটি ছিল রূপকথার মতো অটুট। ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই সম্পর্কের গভীরতা আজীবন টিকে ছিল, যা সমকালীন রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
ষাটের দশকে তৎকালীন ছাত্রলীগে মূলত দুটি আদর্শিক ধারা বা গ্রুপ সক্রিয় ছিল। এক পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি, আর অন্য পক্ষে সিরাজুল আলম খান। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সিরাজুল আলম খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও স্নেহভাজন। তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক উত্থান এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছাকাছি পৌঁছানোর পেছনে সিরাজুল আলম খানের এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
এই সম্পর্কের সবচেয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্তটি তৈরি হয়েছিল ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। রেসকোর্স ময়দানে কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন চলছে। লাখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ডাকসুর তৎকালীন ভিপি তোফায়েল আহমেদ বক্তব্য দিতে মঞ্চে উঠবেন, ঠিক তখনই সিরাজুল আলম খান তাঁর হাতে একটি চিরকুট গুঁজে দেন।
সেই চিরকুটে লেখা ছিল— “প্রিয় নেতা, বাংলার মানুষের জন্য আপনি জীবনের সেরা সময়গুলো কারাগারে কাটিয়েছেন। মানুষের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন। আপনি বাঙালি জাতির বন্ধু, বাংলার বন্ধু, বঙ্গবন্ধু।”
সিরাজুল আলম খানের দেওয়া সেই চিরকুট থেকেই তোফায়েল আহমেদ বাংলার জনমানুষের নেতাকে ভূষিত করেন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে। মুহূর্তের মধ্যে লাখো জনতার কণ্ঠ চিরে স্লোগান উঠেছিল— “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা।”
২০১৭ সালের এক সন্ধ্যায় তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বেইলি রোডের সরকারি বাসভবনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই দুই নেতার আজীবন বন্ধুত্বের প্রমাণ দেয়। সাংবাদিক নঈম নিজাম কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই মন্ত্রীর বাসায় গিয়ে দেখেন, একটি গাড়ি বের হয়ে যাচ্ছে এবং তোফায়েল আহমেদ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে গাড়ির আরোহীকে বিদায় জানাচ্ছেন।
গাড়ির ভেতরের মানুষটি আর কেউ নন, স্বয়ং সিরাজুল আলম খান। অসুস্থ শরীর নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে প্রিয় অনুজের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তিনি।
সেদিন আবেগাপ্লুত তোফায়েল আহমেদ স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন:
“সিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বহু বছরের। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি, ডাকসু বা ছাত্রলীগ—সবখানেই তাঁর অবদান ছিল। আমি সবসময় তাঁর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, বিশেষ করে ওঁর চিকিৎসার দিনগুলোয়।”
টেলিভিশনের টকশোতে (চ্যানেল আইয়ের ‘তৃতীয় মাত্রা’) এই সত্য ইতিহাস অকপটে স্বীকার করায় তোফায়েল আহমেদকে দলের ভেতরে অনেকেরই ভ্রুকুটি সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি হাসিমুখে বলেছিলেন, “ইতিহাস তো বলে যেতে হবে।”
স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতার কারণে সিরাজুল আলম খান গড়ে তুলেছিলেন ‘জাসদ’, আর তোফায়েল আহমেদ থেকেছেন আওয়ামী লীগের মূল ধারায়। রাজনীতির এই চরম বিভক্তিও তাঁদের ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাবোধে কখনো ফাটল ধরাতে পারেনি। তবে জীবনের শেষভাগে এসে তোফায়েল আহমেদ বর্তমান রাজনীতির পরশ্রীকাতরতা ও সহনশীলতার অভাব নিয়ে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, আগে তাঁরা শেরাটন হোটেল বা বাসায় গিয়ে নিয়মিত সিরাজ ভাইয়ের সাথে দেখা করতেন। কিন্তু এখনকার রাজনীতিতে সেই উদারতা নেই। ভিন্ন মতের কারও সাথে দেখা করলেই পেছনে লোক লাগানো হয়, গোয়েন্দা রিপোর্ট হয়, মনগড়া গল্প বানানো হয়।
বঙ্গবন্ধুর উদারতার উদাহরণ টেনে তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন:
“বঙ্গবন্ধু আমাকে দিয়ে কারাগারে থাকা রাজনৈতিক বিরোধী শাহ আজিজুর রহমানের পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতেন। খান এ সবুরকে মুক্তি দিয়েছিলেন। আর এখন আমরা ব্যক্তিগত সম্পর্কও রাখতে পারব না? এটা কেমন রাজনীতি!”
উপসংহার: তোফায়েল আহমেদ ও সিরাজুল আলম খানের এই সম্পর্কটি আমাদের শেখায় যে, আদর্শ বা রাজনৈতিক মত পথ ভিন্ন হতেই পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর পুরনো দিনের স্মৃতির বন্ধন চিরকাল রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। সমকালীন বাংলাদেশের দ্বান্দ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁদের এই পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান সত্যিই এক অনন্য অনুকরণীয় ইতিহাস।
লেখকঃ বিশিষ্ট সাংবাদিক