খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় একটি পুরোনো ধর্ষণ মামলার বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনায় ১৮ বছর বয়সি এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর গর্ভপাত ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী গৃহবধূর নাম আফসানা, যিনি স্থানীয় একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী এবং দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এই বর্বরোচিত হামলায় তার স্বামী মো. আলী আকবরও (২৬) গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। বর্তমানে আফসানা আশঙ্কাজনক অবস্থায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই বিরোধের সূত্রপাত মূলত ২০১৪ সালের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আফসানার দেবর অনিকের শ্বশুর আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে তার বোনের পাঁচ বছর বয়সি কন্যাসন্তানকে ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলাটিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে উভয় পরিবারের মধ্যে তীব্র বিরোধ ও শত্রুতা চলে আসছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, সুদীর্ঘ সময় পার হলেও তারা ওই পূর্ববর্তী ঘটনার সুষ্ঠু বিচার পাননি।
গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে পূর্ব শত্রুতার জেরে প্রতিবেশী চান মিয়া, রওসোনারা, রুমানা ও শিমুলসহ ৬ থেকে ৭ জন ব্যক্তি সংঘবদ্ধ হয়ে আলী আকবরের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এ সময় স্বামীকে বাঁচাতে আফসানা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা তাকেও বেধড়ক মারধর করে।
আফসানার পিতা মো. শহিদুল ইসলাম জানান, মারধরের খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় আহত দম্পতিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে ইন্দেরহাট বাজার এলাকায় দ্বিতীয় দফায় তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এবার অনিক ও কাওসারসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই হামলায় অংশ নেন। ঘটনার সময় আফসানা তার পিতাকে মুঠোফোনে বিষয়টি জানালে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে সাহায্য চান, কিন্তু সেখান থেকে কোনো পুলিশি সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহতদের উদ্ধার করে নেছারাবাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আলী আকবরকে তিন দিন চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে আফসানার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের (ব্লিডিং) কারণে আফসানার গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনা প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ব্যক্তি ও পদবি | ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রদত্ত বক্তব্য এবং অবস্থান |
| আফসানা (ভুক্তভোগী গৃহবধূ) | শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, তীব্র শ্বাসকষ্ট ও রক্তক্ষরণের কারণে কথা বলতে পারছিলেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে গর্ভের সন্তান নষ্ট হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। |
| মো. শহিদুল ইসলাম (আফসানার পিতা) | হামলাকারীদের অমানুষিক নির্যাতনের কারণেই গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়েছে। থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও পুলিশ তা মামলা হিসেবে গ্রহণ করেনি বলে দাবি। |
| অনিক ও চান মিয়া (অভিযুক্ত পক্ষ) | মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। অনিকের দাবি, তারা কাউকে মারেননি, বরং ভুক্তভোগী পক্ষই তার বাবা-মাকে মারধর করেছে। |
| সাঈদুর রহমান সাঈদ (চেয়ারম্যান, বলদিয়া ইউপি) | ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে দুপক্ষের কেউই ইউনিয়ন পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। |
| ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ (ইউএইচএফপিও, নেছারাবাদ) | ৪ জুন বিকালে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আফসানা ভর্তি হন। ৬ জুন বিকালে হঠাৎ তার রক্তক্ষরণ শুরু হলে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে বরিশালে রেফার করা হয়। |
| সঞ্জয় মজুমদার (পুলিশ পরিদর্শক, নেছারাবাদ থানা) | ভুক্তভোগীর পিতা প্রথমে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন, যেখানে গর্ভপাতের কথা উল্লেখ ছিল না। জিডিটি আদালতে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসা সনদ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। |
ঘটনার সময় উপস্থিত একাধিক নারী প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তারা যখন আফসানাকে মারধরের হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে যান, তখন হামলাকারীরা তাদেরও বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন।
নেছারাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে থানার পুলিশ পরিদর্শক সঞ্জয় মজুমদার জানিয়েছেন, পুলিশ ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। ভুক্তভোগী পরিবার যদি চিকিৎসকের আনুষ্ঠানিক সনদ এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রমাণপত্র জমা দেয়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুযায়ী মামলা দায়েরসহ পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।