খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) একতরফা পুশইনের (অনুপ্রবেশের চেষ্টা) আশঙ্কা কিছুটা কমলেও সীমান্তজুড়ে এখনো তীব্র সতর্কতা, উৎকণ্ঠা ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত কয়েকদিনে নতুন করে কোনো পুশইনের ঘটনা না ঘটলেও বিজিবির কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে, সীমান্তের ওপারে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জড়ো করে রাখা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও অবৈধ অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় বেনাপোল সীমান্তে আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে বেনাপোলের সাদিপুর, দৌলতপুর, পুটখালী, কাগজপুকুর, ঘিবা ও সীমান্তঘেঁষা বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, বিজিবি সদস্যরা সার্বক্ষণিক টহল ও কড়া নজরদারিতে নিয়োজিত রয়েছেন। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি রাতে টহল কার্যক্রম ব্যাপক হারে বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যেও সর্বোচ্চ সতর্কতা লক্ষ্য করা গেছে এবং তারা স্বেচ্ছায় তথ্য দিয়ে বিজিবিকে সার্বিক সহযোগিতা করছেন।
স্থানীয় ও বিজিবি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ৩১ মে গভীর রাতে বিএসএফ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টের আলো নিভিয়ে শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে ‘বাংলাদেশি’ দাবি করে বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। এর আগে সীমান্তের ওপারে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ জন লোককে জড়ো করার সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য পায় বিজিবি। তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর বিজিবি সদস্যরা দ্রুত সীমান্তে অবস্থান নেন এবং কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলে বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। ফলে ওই ব্যক্তিরা সীমান্তের শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) অবস্থান করতে বাধ্য হন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, প্রায় দুই দিন ধরে ওই নারী, শিশু ও পুরুষদের দলটি সীমান্তের শূন্যরেখায় অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করে। প্রচণ্ড গরম, বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, খাদ্যাভাব এবং চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা সেখানে দিন কাটায়, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছিল নারী ও শিশুরা। পরবর্তীতে ২ জুন রাতের দিকে বিএসএফের সদস্যরা তাদের শূন্যরেখা থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকে সীমান্তজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
নিচে ঘটনার ক্রমানুসার ও বর্তমান সীমান্ত সুরক্ষার চিত্র একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| তারিখ ও সময় | ঘটনার বিবরণ | বিজিবি ও স্থানীয়দের পদক্ষেপ | বর্তমান অবস্থা |
| ৩১ মে (গভীর রাত) | বিএসএফ কর্তৃক ১০০-১২০ জন মানুষকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা। | বিজিবির তাৎক্ষণিক অবস্থান গ্রহণ ও প্রতিরোধ। | পুশইন সফলভাবে প্রতিহত। |
| ১ – ২ জুন | নারী ও শিশুসহ দলটির শূন্যরেখায় মানবেতর অবস্থান। | গ্রামবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও রাত জেগে পাহারা। | ২ জুন রাতে বিএসএফ কর্তৃক তাদের প্রত্যাহার। |
| ৩ জুন | এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সীমান্ত পরিদর্শন। | স্থানীয় জনগণ ও বিজিবি সদস্যদের সাথে মতবিনিময়। | সীমান্ত সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান। |
| ৯ জুন (সকাল) | সাদিপুর, দৌলতপুরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যবেক্ষণ। | সদর দপ্তরের নির্দেশনায় দ্বিগুণ বিজিবি মোতায়েন ও নজরদারি। | পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, তবে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি। |
সাদিপুর গ্রামের বাসিন্দা সাগর হোসেন জানান, ১ জুন সকালে তারা জানতে পারেন যে বিজিবি পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করেছে। এরপর গ্রামের মানুষ নিজস্ব উদ্যোগে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নেয় এবং বিজিবি সদস্যদের সাথে রাত জেগে পাহারা দেয়। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক মনে হলেও সবাই সতর্ক রয়েছে। একই গ্রামের জসিম উদ্দিন বলেন, “সীমান্ত রক্ষা শুধু বিজিবির দায়িত্ব নয়, দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। তাই আমরা বিজিবিকে সহযোগিতা করেছি।”
বেনাপোল বাজারের ব্যবসায়ী পলাশ আহমেদ জানান, পুশইনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে বিজিবির দৃঢ় অবস্থান ও দ্রুত পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি জটিল হতে পারেনি। আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একতরফাভাবে কাউকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় থাকা সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বেনাপোল চেকপোস্ট আইসিপি ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার মিজান হোসেন জানান, তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে ওপারে বিএসএফের বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জড়ো করে রাখা হয়েছে, যাদের বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করা হতে পারে। এই কারণে সদর দপ্তরের নির্দেশনায় সীমান্তে বিজিবির জনবল দ্বিগুণ করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বলেন, বর্তমানে বেনাপোল সীমান্তে নতুন করে পুশইনের কোনো ঘটনা ঘটছে না এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে নিয়মিত টহল অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, যাদের পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছিল তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশি নাগরিক কিনা, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বৈধ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কেউ যদি নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশি হয়ে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক আলোচনা এবং প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো যেতে পারে। রাতের আঁধারে বা একতরফাভাবে জোরপূর্বক কাউকে সীমান্ত পার করে দেওয়ার কোনো বৈধতা নেই।