খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন উপজেলার সীমানাধীন পদ্মা নদীতে একটি যাত্রীবাহী দ্রুতগামী জলযান বা স্পিডবোট আটকে অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এই সশস্ত্র ডাকাতির সময় এক গরু ব্যবসায়ীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার পাশাপাশি তাঁর কাছে থাকা নগদ অর্থ, মুঠোফোন এবং আক্রান্ত স্পিডবোটের চালিকা ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট করে নিয়ে গেছে ডাকাত দল। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে চরভদ্রাসন উপজেলার চর ঝাউকান্দা ইউনিয়ন সংলগ্ন পদ্মা নদীর বুকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে।
নৌপথে ডাকাতির শিকার হওয়া ওই ব্যবসায়ীর নাম লিটন মোল্লা (৩২)। তিনি চরভদ্রাসন সদর ইউনিয়নের অন্তর্গত মৌলভীরচর কারিকরডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা কোমর মোল্লার ছেলে। ঘটনার পর স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার একটি চিকিৎসালয়ে বা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যদিকে ডাকাত দলের অতর্কিত ধাওয়া ও আক্রমণের মুখে আক্রান্ত স্পিডবোটের চালক সঞ্জিত খালাসী (৩৯) নদীতে লাফিয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী ঘন কাশবনে পালিয়ে গিয়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করেন। পরবর্তীতে পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে চরভদ্রাসন থানা সদরে নিয়ে আসে। উদ্ধার হওয়া চালক সঞ্জিত খালাসী চরভদ্রাসন সদর ইউনিয়নের খালাসীডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেলের দিকে আটজন গরু ব্যবসায়ীকে ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা নামক গরুর হাট থেকে ব্যবসা শেষ করে ফেরার পথে চরভদ্রাসনের গোপালপুর ঘাট থেকে স্পিডবোটে করে দোহার উপজেলার মৈনট ঘাটে নিরাপদে পৌঁছে দেন চালক সঞ্জিত খালাসী। ব্যবসায়ীদের মৈনট ঘাটে নামিয়ে দিয়ে পুনরায় চরভদ্রাসনে ফিরে আসার পথে ওই স্পিডবোটে একমাত্র সাধারণ যাত্রী হিসেবে আরোহন করেছিলেন লিটন মোল্লা।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে স্পিডবোটটি ঢাকা জেলার সীমান্ত অতিক্রম করে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার জলসীমায় প্রবেশ করার পরপরই স্থানীয় ফারুক মোল্লার চরের কাছে পৌঁছালে একটি দ্বৈত ইঞ্জিনচালিত বা ডাবল ইঞ্জিনচালিত দ্রুতগামী স্পিডবোট নিয়ে একদল সশস্ত্র ডাকাত তাদের ধাওয়া করে। একপর্যায়ে ডাকাত দলটি তাদের জলযান নিয়ে এসে চলন্ত স্পিডবোটটির গতি রোধ করার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও বেগতিক দেখে চালক সঞ্জিত খালাসী উপস্থিত বুদ্ধির জোরে বোটটি দ্রুত চরের কূলে ভিড়িয়ে দেন এবং রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ঘন কাশবনের মধ্যে আত্মগোপন করেন।
ডাকাতির এই সামগ্রিক ঘটনা, হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট বিবরণ নিচের তালিকায় উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | ঘটনার বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষ সমূহ | আক্রান্ত ব্যক্তির নাম ও পরিচয় | বর্তমান অবস্থা ও লুণ্ঠিত মালামাল |
| ১ | আহত একমাত্র সাধারণ যাত্রী | লিটন মোল্লা (বয়স: ৩২ বছর) | বাম হাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাত, দোহারের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন |
| ২ | অক্ষত উদ্ধার হওয়া জলযান চালক | সঞ্জিত খালাসী (বয়স: ৩৯ বছর) | কাশবনে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা, পুলিশ কর্তৃক নিরাপদ উদ্ধার |
| ৩ | লুণ্ঠিত সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পদ | আক্রান্ত স্পিডবোট ও যাত্রী | নগদ টাকা, মুঠোফোন, স্পিডবোটের সম্পূর্ণ চালিকা ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ |
| ৪ | ঘটনার স্থান ও সময়কাল | চর ঝাউকান্দা ইউনিয়ন, পদ্মা নদী | গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা |
চালক পালিয়ে যাওয়ার পর ডাকাত দল স্পিডবোটে থাকা একমাত্র যাত্রী ব্যবসায়ী লিটন মোল্লাকে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রের মুখে সম্পূর্ণ জিম্মি করে ফেলে। তারা তাঁর সাথে থাকা যোগাযোগের মুঠোফোন এবং পকেটে থাকা সমস্ত নগদ টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। একই সাথে ডাকাতেরা অত্যন্ত দক্ষ হাতে স্পিডবোটের মূল চালিকা ইঞ্জিন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যান্ত্রিক অংশগুলো খুলে নিজেদের জলযানে তুলে নেয়। লুণ্ঠন প্রক্রিয়া শেষ করে চলে যাওয়ার ঠিক প্রাক্কালে ডাকাতরা নৃশংসভাবে লিটনের বাম হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গভীর কোপ দেয়। ডাকাত দল চলে যাওয়ার পর ওই নদী দিয়ে যাতায়াতকারী স্থানীয় জেলেরা লিটনের চিৎকার শুনে তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণের ব্যবস্থা করেন।
চরাঞ্চলের ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপন নিয়ে কাজ করা স্থানীয় প্রবীণ সাংস্কৃতিক কর্মী আবদুস সবুর মোল্লা এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিগত ১০ থেকে ১২ বছরের দীর্ঘ সময়কালের মধ্যে এই নির্দিষ্ট নৌপথে এমন সহিংস ডাকাতির ঘটনা আর কখনো শোনা যায়নি। ঢাকা জেলার সাথে চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের সহজ ও দ্রুত যোগাযোগের একমাত্র এই জলপথটি যদি এভাবে অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, তবে তা চরভদ্রাসনসহ আশপাশের সমগ্র চরাঞ্চলবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হবে। তিনি নৌপথে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানান।
নৌপথে সংঘটিত এই ডাকাতির খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে চরভদ্রাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে স্পিডবোট চালক সঞ্জিত খালাসীকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে পুলিশ দল সেখানে পৌঁছানোর পূর্বেই সুসংগঠিত ডাকাত চক্রটি মালামালসহ নদীপথে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পুরো ঘটনার বিষয়ে পুলিশি অনুসন্ধান ও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে এবং এই ঘটনার সাথে জড়িত সংঘবদ্ধ জলদস্যু বা ডাকাত চক্রকে আইনের আওতায় আনতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।