এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু নাম যুগের পর যুগ পাঠকের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকে। রোমেনা আফাজ তেমনই এক কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক, যিনি তাঁর অসাধারণ গল্প বলার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং বিপুল সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ পাঠকদের কাছে তিনি আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। তাঁর সৃষ্ট কালজয়ী চরিত্র ‘দস্যু বনহুর’ বাংলা রহস্য ও রোমাঞ্চ সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় নাম।
১৯২৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার শেরপুর শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজেম উদ্দীন আহমদ এবং মাতা বেগম আছিয়া খাতুন। শৈশব থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা ছিল ‘বাংলার চাষী’ শীর্ষক একটি ছড়া, যা কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রখ্যাত ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেই ছোট্ট পদক্ষেপই একদিন তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখকে পরিণত করে।
বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার ফুলকোট গ্রামের ডা. মোহাম্মদ আফাজ উল্লাহ সরকারের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। স্বামীর পদবিই পরবর্তীকালে তাঁর নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয় এবং তিনি সাহিত্যজগতে ‘রোমেনা আফাজ’ নামেই পরিচিতি লাভ করেন।
তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’। এরপর তিনি একের পর এক সামাজিক, ঐতিহাসিক, রোমান্টিক, রহস্য, গোয়েন্দা ও কিশোর উপন্যাস রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তৃতি ছিল বিস্ময়কর। জীবদ্দশায় তিনি প্রায় ২৫০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন, যা বাংলা সাহিত্যে এক বিরল কীর্তি।
তাঁর সৃষ্ট ‘দস্যু বনহুর’ চরিত্রটি তাঁকে এনে দেয় আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। বনহুর ছিল অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক রহস্যময় চরিত্র, যে অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করত নিজস্ব উপায়ে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠক এই চরিত্রের সাহসিকতা, মানবিকতা এবং রোমাঞ্চকর অভিযানের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে রেখেছে। আজও বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যে ‘দস্যু বনহুর’ এক কিংবদন্তি নাম।
রোমেনা আফাজের সাহিত্যকর্ম শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর একাধিক উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ‘কাগজের নৌকা’, ‘মোমের আলো’, ‘মায়ার সংসার’, ‘মধুমিতা’, ‘মাটির মানুষ’ এবং ‘দস্যু বনহুর’। এসব চলচ্চিত্র দর্শকদের কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয় এবং তাঁর সাহিত্যকে আরও বৃহত্তর পাঠক-দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সমাজসেবী। নারীশিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মানুষের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধ তাঁর লেখাতেও প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০১০ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। এছাড়াও বিভিন্ন সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন থেকে তিনি অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন।
তাঁর স্মৃতিকে সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর সাহিত্যকর্ম পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘রোমেনা আফাজ স্মৃতি পরিষদ’। বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলায় অবস্থিত তাঁর বাড়িটিও বর্তমানে স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে, যা তাঁর সাহিত্যিক জীবনের এক মূল্যবান সাক্ষ্য বহন করছে।
২০০৩ সালের ১২ জুন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু মৃত্যু তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলো, তাঁর গল্পের আবেগ, তাঁর কল্পনার জগৎ আজও পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদপ্রতিম কথাশিল্পীকে। তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক নন; তিনি ছিলেন এক প্রজন্মের স্বপ্ন, কল্পনা ও রোমাঞ্চের নির্মাতা।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
“মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো বেঁচে থাকে পাঠকের হৃদয়ে। রোমেনা আফাজ আজ নেই, কিন্তু দস্যু বনহুরের দুরন্ত পদচারণা এখনও বাংলা সাহিত্যের অলিগলিতে শোনা যায়।”