খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে আয়োজিত এক সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক সমাবেশে বিশিষ্ট লেখক ও শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, বাংলাদেশ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং শেষ পর্যন্ত দেশ একাত্তরের সেই মূল আদর্শেই ফিরে যাবে। ইতিহাসকে অস্বীকার বা মুছে ফেলার যেকোনো চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে, যারা স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে, তারা জনগণের কাছে চিহ্নিত এবং তাদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। নিজের এই দুই বছরের প্রবাস জীবনকে ‘নির্বাসিত জীবন’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি দেশের রাজনীতি ও ইতিহাসের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “একটি গোষ্ঠী ইতিহাস থেকে রিসেট বাটন টিপে সব মুছে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে আমি বুঝি—প্রতিটি ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ইতিহাস এভাবে সহজে মুছে ফেলা যায় না।” মুক্তিযুদ্ধে নিজের পিতা শহীদ হওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশ কখনো একাত্তরের পরাজিত ও বিরোধী শক্তির দখলে স্থায়ী হতে পারে না।
‘একাত্তরের প্রহরী ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুন নবীর বাসভবন প্রাঙ্গণে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। মূলত গত মে মাসে নিউ ইয়র্কের ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলায়’ ঘোষিত ‘নবী-জিনাত সাহিত্য পুরস্কার’ আনুষ্ঠানিকভাবে মুহম্মদ জাফর ইকবালের হাতে তুলে দিতেই এ আয়োজন। অনুষ্ঠানে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহর থেকে প্রগতিশীল লেখক, সাহিত্যিক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা উপস্থিত হন।
অনুষ্ঠানে প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে জাফর ইকবাল বলেন, প্রবাসে থাকা তরুণদের কেবল ‘মিলিয়নিয়ার’ হলেই চলবে না, লক্ষ্য রাখতে হবে ‘বিলিওনিয়ার’ হওয়ার দিকে। সেই অর্জিত সম্পদ ও সক্ষমতা দেশে বিজ্ঞানচর্চার প্রসার এবং নতুন বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করতে হবে, যাতে আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্র ও গবেষণাগার স্থাপন করা যায়।
সমাবেশে মুহম্মদ জাফর ইকবালের সহধর্মিণী ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ইয়াসমিন হক তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ও কঠোর সমালোচনা প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি যিনি করেছেন, তিনি হলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার ভেতরে যে এই পরিমাণ বিষ জমা ছিল, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে আগে বোঝা সম্ভব হয়নি।” তারা সাময়িকভাবে ‘দেশহীন’ পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও দ্রুতই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মূল্যবোধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সমৃদ্ধ বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই সাথে তিনি অভিযোগ করেন, একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে দেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস ও মহান ঐতিহ্যকে বিলীন করার ষড়যন্ত্র করছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে তাঁর স্মৃতি প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। কবি ও সাহিত্যিক ফকির ইলিয়াসের সঞ্চালনায় এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুন নবীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাকারিয়া চৌধুরী, বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ এবং লেখক ও চিকিৎসক সেজান মাহমুদ। উপস্থিত বক্তারা প্রবাসে অবস্থান করেও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মূলধারা রক্ষায় সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান।