খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
মাহফুজুর রহমান:
ইতিহাসের গতি ঘুরানো সহজ কাজ না। গতিপথ ঘুরাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। জাতির জীবনে কখনও কখনও এমন মাহেন্দ্রক্ষণ আসে যখন গতিপথ ঘুরানোর কাজটা সহজ হয়ে যায়। পাঁচই আগস্ট আমাদের জন্য এমন সুযোগ এনে দিয়েছে। আবার দুর্ভাগ্য আমাদের। আমরা বোধ হয় স্মৃতিভ্রষ্ট জাতি। গোল্ডফিশের মতো। জুলাই-আগস্ট জুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করতে সরকার নির্বিচারে যে তাণ্ডব চালিয়েছে, ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনে আমরা এখন যদি ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যতে এ তাণ্ডব আবার আমাদের পিছু নেবে।
নাৎসি শাসনামলের একটি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, যা এখন জাদুঘর, সেখানে দেওয়ালে লেখা আছে, ‘আমরা তোমাদের নির্যাতনের চিহ্নগুলো দেখাচ্ছি যেন তোমরা (যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে) এগুলোর পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে পারো।‘ স্প্যানিশ-আমেরিকান দার্শনিক জর্জ সান্তাইয়ানা তাঁর ‘দ্য লাইফ অফ রিজন’-এ লিখেছেন, ‘যারা অতীত মনে রাখতে পারে না, অতীতের পুনরাবৃত্তিই তাদের ভাগ্যে আছে।‘
জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের ‘২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন’ সম্পর্কিত সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো পড়ার সময় আমার মনে এই কথাগুলো এসেছে। ১১৪ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনটি নিরপেক্ষতার দালিলিক নিদর্শন, এবং একইসঙ্গে উপযুক্ত অনুসন্ধানের পদ্ধতি, অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মান এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত আইন অনুসরণের উদাহরণ। আমরা ভাগ্যবান, অন্তর্বর্তী সরকারের সাহস, সততা, স্পষ্টতা এবং সত্যিকার অর্থে একটি স্বতন্ত্র অনুসন্ধান তৈরি করার সদিচ্ছা ছিল।
প্রতিবেদনে আনুপাতিক বল প্রয়োগের লঙ্ঘন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের দ্বারা সহিংসতা প্ররোচনা, নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড, জবাবদিহিতার অভাব এবং নিরাপত্তা বাহিনীর রাজনীতিকরণ সহ দমন-পীড়নের মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সেসব ঘটনাবলী এসেছে যা আমরা সামাজিক মাধ্যমে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যেমন নিরস্ত্র আবু সাইদের হত্যাকাণ্ড, যাত্রাবাড়িতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও পুলিশের আইজিকে মোবাইল ফোনে বিক্ষোভকারীদের ভিডিয়ো দেখিয়ে পুলিশ অফিসারের তীর্যক মন্তব্য; রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনে রডের মধ্যে ঝুলে আশ্রয় নেওয়া বিক্ষোভকারীকে উপর্যুপরি গুলি; আশুলিয়ায় ভ্যানের উপর একের পর এক নিহত বিক্ষোভকারীদের লাশ উঠিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া; যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে গুলি; ঢাকা-আরিচা হাইওয়েতে পুলিশি আক্রমণে আহত হয়ে পড়ে থাকা মৃতপ্রায় ইয়ামিনকে উপর্যুপরি গুলি করে হত্যা। এসব ঘটনা রোমহর্ষক। বিভীষিকাময়। বিবরণ শুনলে বা ভিডিয়ো দেখলে যে কারো নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। প্রতিবেদনে এসব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এসব ঘটনা একটা-দুটো না। অগণিত। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে প্রতিবেদনের মূল বিষয় হল এর সুপারিশগুলো। অন্তর্বর্তী সরকার হোক বা ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকার, তাদের জন্য সুপারিশগুলো ম্যাগনা কার্টার মতো মূল্যবান। আমি আশা করি অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দল এবং কর্মীরা পুরো প্রতিবেদনটি মনোযোগ সহকারে পড়বেন এবং সুপারিশগুলো হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করবেন এবং তাদের যেকোনো সিদ্ধান্তে সেগুলো প্রতিফলিত করবেন। রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক কর্মীদের এ সুপারিশগুলো সমর্থন করা উচিত এবং শীঘ্র তাদের দীর্ঘমেয়াদি এবং তাৎক্ষণিক কর্মপদ্ধতিতে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত এবং এর প্রতি প্রকাশ্যে নিজেদের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা উচিত।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় [OHCHR] জানিয়েছে যে জুলাই-আগস্ট বিক্ষোভে আহত বেশিরভাগ ভুক্তভোগী বলেছেন, ‘তারা বাংলাদেশে প্রকৃত পরিবর্তন নিয়ে আসতে এবং বাংলাদেশের সকল মানুষের জন্য স্বাধীনতা, সমতা এবং ন্যায্য সুযোগ ফিরে পেতে তাদের জীবন এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন।’ OHCHR এজন্য [রাষ্ট্র এবং সরকার কর্তৃক] মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মরণঘাতী নির্যাতনের মূল কারণগুলো অনুসন্ধান করেছে এবং রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থায় গভীর সংস্কারের উপর জোর দিয়েছে। বিশেষ করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কারের উপর। এখন, কেউ কি মনে করেন যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু করা, র্যাব-এর নাম পরিবর্তন করা বা এমনকি পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করা হলেই কাজের কাজ হয়ে যাবে? সংবিধান হতে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সমাজতন্ত্র তুলে দিলে দেশে দুধের নহর বয়ে যাবে? দু মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীত্ব সীমিত করা হলে রাষ্ট্র স্বর্গ হয়ে যাবে? এসব কসমেটিক সংস্কার কি রাষ্ট্র, সরকার, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীতে কোনো আমূল পরিবর্তন আনবে? জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করবে? সংস্কার কমিশনের সুপারিশকৃত সংস্কারগুলো কি আরও মানবাধিকার লঙ্ঘনের, নিপীড়ন-নির্যাতনের সম্ভাবনাকে মুছে ফেলবে? OHCHR স্পষ্টভাবে বলেছে যে কেবল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের লঙ্ঘনই নয়, রাজনৈতিক সহিংসতার পূর্ববর্তী চক্রগুলোরও জবাবদিহিতা দরকার।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে সিরাজ শিকদার ও কর্নেল তাহেরকে হত্যা করা হয়েছে। রক্ষীবাহিনীর হাতে জাসদের সদস্যসহ বহু নিরপরাধ ব্যক্তি নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগে বা সন্দেহে সশস্ত্র বাহিনীর বহু সদস্যকে বিনা বিচারে বা নামমাত্র বিচারে হত্যা করা হয়েছে। দেশে একাধিক রাষ্ট্রপতি খুন হয়েছেন। আশি-নব্বুইয়ের দশকে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে অনেক নাম জানা-অজানা হতভাগারা শহিদ হয়েছেন। নির্যাতন, হয়রানি, জুলুম ও হত্যার সমস্ত অভিযোগ প্রকাশ করার সুযোগ থাকা উচিত। OHCHR বলেছে সেগুলোর ‘কিছুটা ন্যায়বিচার পাওয়া’ উচিত, এবং তা ‘দেশের ভবিষ্যৎ’ গঠন নিশ্চিত করতে পারে।
প্রথম সুপারিশে জবাবদিহিতা এবং সঠিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও সহিংসতার তদন্ত ও বিচারের জন্য সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং ব্যাপক প্রক্রিয়া, যার মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের কোটা বিক্ষোভের পূর্ববর্তী মামলা; প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সাক্ষীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা; সামরিক কর্মকর্তাসহ পুলিশ ও প্রাশানিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের তদন্ত ও বিচার; রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমুক্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা; মৃত্যুদণ্ডের উপর স্থগিতাদেশ সহ আইসিটি আইন সংস্কার। পুলিশ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সম্পর্কে প্রণীত সুপারিশগুলোও লক্ষণীয়। ওএইচসিএইচআর বিদ্যমান দণ্ডবিধি, পুলিশ আইন, পুলিশ অধ্যাদেশ এবং সম্পর্কিত আইনের কিছু ধারা সংস্কার, বিশেষ করে হেফাজতে মৃত্যু, গোলাবারুদের সীমা নির্ধারণ এবং জনসাধারণকে ছত্রভঙ্গ করার ক্ষেত্রে মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে সুপারিশ করেছে।
র্যাব ভেঙে দেওয়ার, ডিজিএফআইকে কেবল সামরিক গোয়েন্দা কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার এবং বিজিবিকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার সুপারিশ করেছে। এইচসিএইচআর নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবাধ করার কথা বলেছে। এ প্রসঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা আইন, অফিসিয়াল গোপনীয়তা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, এবং সে সঙ্গে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মতো বিদ্যমান কালো আইনের কিছু বিধানের উপর স্থগিতাদেশ দিতে বলেছে যাতে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, আটক, তল্লাশি, জব্দ এবং নজরদারির অনুমতি না মিলে। নাগরিকদের ক্ষমতায়ন এবং দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য OHCHR যে প্রশংসনীয় উপায়গুলোর কথা উল্লেখ করেছে, তার মধ্যে নাগরিক-নেতৃত্বাধীন অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা অন্যতম। পাশাপাশি অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা নিয়েও সুপারিশ করতে দ্বিধা করেনি। এ ক্ষেত্রে বৃহৎ আকারের দুর্নীতি থেকে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ অবিলম্বে জব্দ করার সুপারিশ করেছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচার নিশ্চিত করার জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে বলেছে। ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য কার্টেল এবং অলিগোপলির বিরুদ্ধে জরুরি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উপর জোর দিয়েছে। ‘অন্যায্য শ্রম অনুশীলন এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা’ বন্ধ করার সুপারিশ করেছে এবং প্রত্যক্ষ করের উপর মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
আমি হয়তো প্রতিবেদনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়তো মিস করছি। এ পরিসরে সবকিছু লেখা কঠিন। আমি নিশ্চিত যে উৎসাহী এবং নীতিনির্ধারকরা প্রতিবেদনটি আরও ভালোভাবে দেখবেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি খুঁজে পাবেন। কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মেলে না। আমাদের জীবনে সব সুযোগই আসে চড়া মূল্যে। একটি জাতির জন্য সুযোগ বারবার আসে না। তবে, উপলক্ষ্য যখন এসেছে, দেওয়ালে যখন পিঠ ঠেকেছে, আমাদের জনগণ চরম মূল্য দিতেও দ্বিধা করেনি, বরং অবলীলায় জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। জুলাই-আগস্ট বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের সময় এটি স্পষ্ট ছিল। অনেকেই এখন আন্দোলনের মূল চেতনা নিয়ে বিতর্ক করছেন। কিন্তু আমি যেমন আমার চারপাশের অনেক মানুষকে জিগ্যেস করেছি, যেমন আমি রাস্তায় তখন যাঁদের সঙ্গে দেখা হয়েছে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি, এমনকি জুলাই-আগস্ট আন্দোলন তুঙ্গে থাকার সময় অজানা-অচেনাদের সঙ্গে মত বিনিময়য় করে জেনেছি, অথবা আহত ভুক্তভোগীরা OHCHR-এর সামনে যেমন সাক্ষ্য দিয়েছেন – জনগণের আত্মত্যাগের মূল আশা ছিল একটা সুন্দর দেশ, একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ। যদি আমি OHCHR-এর প্রতিবেদনের সে অংশটি পুনরাবৃত্তি করতে পারি, ওই আত্মত্যাগ ‘স্বাধীনতা, সাম্য এবং ন্যায্য সুযোগের জন্য’।
স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায্য সুযোগ সৃষ্টি করাটাই আমাদের সামনে ইতিহাস গড়ার বা ইতিহাসের পথ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এতদিন রাজনৈতিক বিরোধ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তায় যা কেবল আমাদের বিভক্ত করেছে, যা কখনও আমাদের সবার জন্য ন্যায়বিচার এবং সম্ভাবনা নিশ্চিত করেনি; ঐক্যের মাধ্যমে আমরা তা অনায়াসে অর্জন করতে পারি। যদি আমরা এবারের সুযোগটাও হাতছাড়া করি, তাহলে আমরা নিজেদের দুর্ভাগা প্রমাণ করব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আউশভিৎজ নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে যেতে পেরেছিলেন এমন একজন ইতালীয় বন্দি লেখক প্রিমো মিশেল লেভি বলেছেন, “এটি ঘটেছে; তাই, এটি আবার ঘটতে পারে: এটুকুই আমার বলার মূল কথা।”
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কলামিস্ট
খবরওয়ালা/এমএজেড