জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাবেক কূটনৈতিক রিপোর্টার আনিস আলমগীর বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক বিবৃতির ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ভারতের মাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি প্রকাশকে তিনি যৌক্তিক বলে মনে করলেও, সেই আপত্তি প্রকাশের ভাষা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতি ও পেশাদার মানদণ্ডের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেই বিষয়েই তিনি সমালোচনা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আনিস আলমগীর বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল এবং সরকার সেটিই করেছে। তবে তাঁর মতে, একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে যে ধরনের সংযত, ভারসাম্যপূর্ণ ও কূটনৈতিক ভাষা প্রত্যাশিত, সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে তার ঘাটতি রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে প্রকাশিত ওই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর একাধিকবার সম্পাদনা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, পোস্টটি অন্তত আটবার সংশোধন করা হয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিবৃতির প্রস্তুতি ও প্রকাশ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। একই সঙ্গে পোস্টটিতে বিপুলসংখ্যক ‘হাহা’ প্রতিক্রিয়া পড়ার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি বার্তার প্রতি এমন প্রতিক্রিয়া জনমনে এর ভাষা ও উপস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নের ইঙ্গিত দেয়।
বিবৃতিতে ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দগুচ্ছ নিয়েও কড়া সমালোচনা করেন আনিস আলমগীর। তাঁর ভাষ্য, “Mafia enterprise”, “Henchmen”, “Venomous vitriol” এবং “Criminal cohort”-এর মতো শব্দচয়ন সাধারণ কূটনৈতিক নথির চেয়ে রাজনৈতিক সমাবেশের বক্তৃতার ভাষার সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরতে ভাষা হওয়া উচিত সংযত, আইনি ভিত্তিসম্পন্ন এবং এমনভাবে রচিত, যাতে তা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত না করে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান দায়িত্ব কি রাজনৈতিক ভাষ্য দেওয়া, নাকি আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের স্বার্থকে শান্ত, পরিমিত ও পেশাদার কৌশলে উপস্থাপন করা। তাঁর মতে, কূটনৈতিক যোগাযোগের মূল শক্তি আবেগঘন শব্দ প্রয়োগে নয়; বরং যুক্তি, নথিভিত্তিক অবস্থান এবং পরিমিত ভাষার মধ্যেই নিহিত।
আনিস আলমগীর বিশেষভাবে বিজ্ঞপ্তির সেই অংশের সমালোচনা করেন, যেখানে ভারতের ভূমিকার প্রসঙ্গে বিষয়টিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর মতে, কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ সাধারণত কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে, বিশেষ করে ‘নোট ভার্বাল’ বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে জানানো হয়। প্রকাশ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন ভাষা ব্যবহৃত হলে ভবিষ্যৎ আলোচনার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি আরও বলেন, “Dark days of fascism” বা “Client State”-এর মতো রাজনৈতিক অভিধা একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির আনুষ্ঠানিক ভাষাকে বিতর্কিত করে তুলতে পারে। তাঁর দৃষ্টিতে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য এবং কূটনৈতিক ভাষা এক নয়; এ দুটি ক্ষেত্রের শব্দচয়ন ও উপস্থাপনার ধরনও ভিন্ন হওয়া উচিত।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে আনিস আলমগীর মন্তব্য করেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আবেগ বা ক্ষোভ প্রকাশেরও একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। কোনো রাষ্ট্রের আইনি ও রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে হলে ভাষা হতে হবে পরিমিত, দায়িত্বশীল এবং সুপরিকল্পিত। তাঁর মতে, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ বা আক্রমণাত্মক শব্দচয়ন অনেক সময় মূল বার্তার গুরুত্বকে আড়াল করে দেয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে রাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলতে পারে। তাই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে কূটনৈতিক যোগাযোগে সংযম, পেশাদারিত্ব এবং প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রীতিনীতির অনুসরণই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
মন্তব্য