সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষের অর্থ দাবির অভিজ্ঞতা মানুষের অজানা নয়। তবে কোন দপ্তরে ঠিক কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, সেই সুনির্দিষ্ট অঙ্ক এবং অভিজ্ঞতার বিস্তারিত তথ্য নথিবদ্ধ করতে চালু হয়েছে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—‘ঘুষসাইট’। প্ল্যাটফর্মটির মূল বার্তা হলো, “দপ্তরের নাম বলুন। দাবিকৃত টাকার কথা লিখুন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম-পরিচয় গোপন রাখুন।” কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা ছাড়াই এবং নাম, ই-মেইল বা ফোন নম্বর গোপন রেখে নাগরিকেরা এখানে নিজেদের ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতার কথা জানাতে পারছেন।
বাংলাদেশি দুই তরুণ উদ্যোক্তা সাইফ কবির ও সাহেদ শরীফ গত ২১ আগস্ট প্ল্যাটফর্মটি চালু করেন। তাঁরা জানান, ভারতের ‘bribes.fyi’ নামের একটি ওয়েবসাইট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র এক দিনের মধ্যে তাঁরা এর বাংলাদেশ সংস্করণ তৈরি করে ফেলেন। তাঁদের লক্ষ্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি অভিযোগ প্রমাণ করা নয়, বরং সরকারি সেবা খাতে অনিয়ম ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ দাবির একটি উন্মুক্ত ‘পাবলিক লেজার’ তৈরি করা। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির একটি নির্দিষ্ট ধরন বা প্যাটার্ন ফুটে উঠবে।
সাইটের পরিসংখ্যান অনুসারে ২১ থেকে ২৩ আগস্টের মধ্যে দেশের ৮টি বিভাগে জমা হওয়া বিভিন্ন অযাচাইকৃত রিপোর্টের আঞ্চলিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
বিভাগভিত্তিক ঘুষ দাবির তথ্যের সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিভাগ | জমা পড়া রিপোর্টের সংখ্যা |
| ঢাকা | ২৫৪ |
| চট্টগ্রাম | ৯৮ |
| সিলেট | ২৪ |
| রাজশাহী | ২২ |
| খুলনা | ২২ |
| ময়মনসিংহ | ১৬ |
| রংপুর | ১৫ |
| বরিশাল | ৭ |
উন্মুক্ত এই প্ল্যাটফর্মে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৪৫৮টি রিপোর্টে প্রায় ২.৪৫ কোটি টাকা ঘুষ দাবির তথ্য উঠে এসেছে। গড় হিসাব অনুযায়ী প্রতি রিপোর্টে দাবিকৃত অর্থ ছিল ৩৩,৭৪৭ টাকা। তবে জমি, কাস্টমস ও কর সংক্রান্ত কিছু বড় ঘটনার কারণে এই গড় কিছুটা বেড়েছে, যেখানে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল লাখ লাখ টাকা।
পদ্ধতিগত দিক থেকে সাইটটিতে রিপোর্ট প্রকাশের প্রক্রিয়াটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে ব্যবহারকারী দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, অবস্থান, দাবিকৃত টাকার পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত ঘটনাটির কী পরিণতি হলো তা বিস্তারিত লেখেন। দ্বিতীয় ধাপে জমা পড়া তথ্যকে একটি স্বয়ংক্রিয় মডারেশন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। একটি ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের সাহায্যে নাম, ফোন নম্বর, এনআইডি, ফাইল নম্বর বা অন্য কোনো ব্যক্তিপরিচয় এবং আপত্তিকর ভাষা বাদ দেওয়া হয়। তৃতীয় ধাপে সব ধরনের ব্যক্তিপরিচয় ছাড়াই তথ্যটি ওয়েবসাইটে জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়।
নির্মাতা সাইফ কবির স্পষ্ট জানান, এই ব্যবস্থাটি মূলত গোপনীয়তা রক্ষার একটি মাধ্যম, কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের যন্ত্র নয়। জমা পড়া রিপোর্টগুলো ব্যবহারকারীদের নিজস্ব বক্তব্য এবং তা পুরোপুরি অযাচাইকৃত। বিশালসংখ্যক তথ্য সশরীরে যাচাই করার মতো লোকবল তাঁদের নেই। তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম প্রকাশের ওপর এখানে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, কারণ এটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোনো অভিযোগ ব্যবস্থা নয়।
প্ল্যাটফর্মটিতে জমাকৃত তথ্য অনুসরণের মাধ্যমে কোনো দপ্তরে সেবা নিতে যাওয়ার আগেই সাধারণ মানুষ আগাম ধারণা পাবেন। একই সঙ্গে এগুলো সাংবাদিক, গবেষক ও নীতি নির্ধারকদের জন্য প্রাথমিক গবেষণার উপাদান হিসেবে কাজ করবে। বহু মানুষ ঘুষ দেওয়ার ঘটনাটি আড়ালেই রেখে দেন। বেনামে হলেও এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেই দীর্ঘ নীরবতা ভাঙবে এবং ভবিষ্যতে তথ্যের সংখ্যা যত বাড়বে, সরকারি সেবা খাতের দুর্নীতির প্রকৃত রূপটিও ততটাই স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।


