কুড়িগ্রামে সার সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষকেরা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত ডিলার পয়েন্টে বিপুলসংখ্যক কৃষককে একসঙ্গে জড়ো করে সার বিতরণ করায় তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা, বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনা। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও হামলার শিকার হয়েছেন। কোথাও কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেছেন, কোথাও আবার ক্ষোভের মুখে ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থল ছাড়তে হয়েছে।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নতুন অনন্তপুর বাজারে সারের দাবিতে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেন। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, সকাল থেকে সার পাওয়ার আশায় কৃষকেরা অপেক্ষা করলেও নির্ধারিত সময়ে ডিলারের লোকজন না আসায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা কুড়িগ্রাম-চিলমারী আঞ্চলিক সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং পরে সার বিতরণ শুরু হয়।
এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম সদরের ঘোগাদহ ইউনিয়নে সার বিতরণে বিলম্ব ও বিশৃঙ্খলাকে কেন্দ্র করে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হামলার শিকার হন। এর দুই দিন আগে, ১৮ সেপ্টেম্বর নাগেশ্বরীর বল্লভেরখাস ইউনিয়নে সারের দাবিতে সড়ক অবরোধের পাশাপাশি একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে ডিলারের গুদামে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করা হয়।
এ ধরনের ঘটনা কেবল উলিপুর বা নাগেশ্বরীতেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৬ সেপ্টেম্বর চর রাজিবপুরে ডিলারের গুদাম থেকে বিক্ষুব্ধ কৃষকদের সারের বস্তা নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর আগে রৌমারী ও ভূরুঙ্গামারীতেও সার বিতরণ ঘিরে উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া গেছে।
সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে সার বিতরণের পদ্ধতি। বর্তমানে অনেক এলাকায় একটি ডিলার পয়েন্টে ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক কৃষককে একসঙ্গে এনে সার দেওয়া হচ্ছে। ফলে সীমিত সময়ের মধ্যে বড় ভিড় তৈরি হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় হাতে থাকা সার কম মনে হওয়ায় অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
উলিপুরের পাঁচপীর বাজারে বিসিআইসি অনুমোদিত এক ডিলার পয়েন্টে গিয়ে কৃষকদের এমন ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়। সেখানে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা সার নেওয়ার জন্য জড়ো হন। কয়েকজনকে সার দেওয়ার পরও অনেক কৃষককে ফিরে যেতে হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
যমুনা এলাকার কৃষক রুহুল আমিন বলেন, তিনি কয়েক দিন ধরে সার পাওয়ার জন্য ঘুরছেন। কাজ ফেলে বারবার ডিলার পয়েন্টে আসতে হচ্ছে। তার ভাষায়, কৃষিকাজের পাশাপাশি দিনমজুরির কাজও করতে হয়। দীর্ঘ সময় সার পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করায় দুদিকেই ক্ষতি হচ্ছে।
একই এলাকার অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ও কৃষক সোলজারও বর্তমান পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মতে, আগে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সার সংগ্রহ করা যেত। এখন এক জায়গায় অনেক কৃষককে জড়ো করায় অপেক্ষার সময় বাড়ছে এবং ভোগান্তিও বাড়ছে।
ডিলারদের পক্ষ থেকেও একই সমস্যার কথা বলা হচ্ছে। একজন বিসিআইসি সার ডিলার জানান, গত বছর খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের ব্যবস্থা থাকায় কৃষকেরা নিজ নিজ এলাকার কাছাকাছি স্থান থেকে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে পারতেন। এবার ডিলার পয়েন্টকেন্দ্রিক বিতরণ হওয়ায় একই স্থানে বিপুলসংখ্যক কৃষকের সমাগম হচ্ছে। তার মতে, ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার দেওয়া হলে চাপ কমতে পারে।
সার বিতরণ নিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গত ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার শহীদুল ইসলাম। বৈঠকে কৃষকদের সুবিধা এবং সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করতে ডিলারের গুদামের পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক নিবন্ধিত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে মাঠপর্যায়ে সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় সমস্যা কমছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষি বিভাগকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে বিতরণের সিদ্ধান্ত থাকলেও অনেক এলাকায় এখনো মূলত ডিলার গুদাম থেকেই সার দেওয়া হচ্ছে।
কৃষকদের এই ভোগান্তির মধ্যেই সমস্যা সমাধানে নতুন একটি উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আসন্ন রবি মৌসুমে প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে ‘মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষি বিভাগ। কার্ডে কৃষকের পরিচয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জমির পরিমাণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য রাখার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের কাছে সার পৌঁছানো এবং বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কৃষকদের বক্তব্য, সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত না হলে শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের দাবি, এলাকার কৃষকদের তালিকা করে কাছাকাছি খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হলে একদিকে যেমন বড় ভিড় কমবে, অন্যদিকে কৃষকদের কর্মঘণ্টাও নষ্ট হবে না।
প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন। কারণ সার নিয়ে বারবার উত্তেজনা তৈরি হলে তা শুধু কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত করে না, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের ওপরও চাপ বাড়ায়। কুড়িগ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই সংকটেরই প্রতিচ্ছবি।


