প্রেমের সম্পর্কে ব্যর্থতা ও আর্থিক সংকটের পর মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন ৩২ বছর বয়সী নাজমুল ইসলাম বাপ্পি। একপর্যায়ে দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় নিজেই ইয়াবা তৈরির পরিকল্পনা করেন। এ জন্য ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সংগ্রহ করেন মাদক তৈরির কৌশল। পরে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও রাসায়নিক উপাদান জোগাড় করে নিজ বাড়িতেই গড়ে তোলেন ইয়াবা তৈরির মিনি কারখানা। গাজীপুরের টঙ্গীতে অভিযান চালিয়ে এমন একটি গোপন কারখানার সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। এ সময় মাদক তৈরির সরঞ্জাম ও রাসায়নিক উপাদানসহ নাজমুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন টঙ্গী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. এরশাদুল রহমান।
গ্রেপ্তার নাজমুল ইসলাম বাপ্পির বয়স ৩২ বছর। তিনি টঙ্গীর পাগার আলেক টেক এলাকার বাসিন্দা তাইজুল ইসলামের বড় ছেলে। শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে ওই এলাকার একটি আবাসিক বাড়িতে অভিযান চালায় টঙ্গী পূর্ব থানা-পুলিশের একটি দল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বেশ কয়েক দিন ধরেই নাজমুলের বসতবাড়ির ওপর নজর রাখছিলেন গোয়েন্দারা। বাড়িটিতে সন্দেহজনক কার্যক্রম চলছে—এমন তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সন্দেহের সত্যতা পাওয়ার পর শুক্রবার গভীর রাতে সেখানে অভিযান চালানো হয়।
অভিযানের সময় বাড়ির ভেতরের একটি কক্ষে ইয়াবা তৈরির কারখানার সন্ধান পান পুলিশ সদস্যরা। সেখানে মাদক উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি, আধুনিক সরঞ্জাম এবং বেশ কিছু রাসায়নিক উপাদান মজুত ছিল। পরে এসব সরঞ্জাম ও উপাদান জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে নাজমুলকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নাজমুল দাবি করেছেন, একটি প্রেমের সম্পর্কে ব্যর্থতা ও প্রতারণার অভিজ্ঞতার পর তিনি মানসিক ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দ্রুত অর্থ উপার্জনের পথ খুঁজছিলেন তিনি। একপর্যায়ে ইয়াবা তৈরির পরিকল্পনা করেন। এ বিষয়ে ধারণা নিতে ইন্টারনেটে বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান করেন। ফেসবুক ও ইউটিউব থেকেও ইয়াবা তৈরির কৌশল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে নিজের বাড়ির একটি কক্ষে উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তবে ঠিক কত দিন ধরে তিনি এই কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন, কত পরিমাণ ইয়াবা উৎপাদন করেছেন কিংবা সেগুলো কোথায় সরবরাহ করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো জানা যায়নি। এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নাজমুল বিদেশে ছিলেন। সেখান থেকে দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত জীবনের সংকট ও মাদকাসক্তির মধ্যে জড়িয়ে পড়ে নিজেই মাদক উৎপাদনের মতো গুরুতর অপরাধে সম্পৃক্ত হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
টঙ্গী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. এরশাদুল রহমান জানান, নাজমুলের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ রাসায়নিক উপাদান ও ইয়াবা তৈরির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি মজুত ছিল। অভিযান চালিয়ে এসব সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে
নিজ বাড়িতে মাদক তৈরির সরঞ্জাম মজুত এবং উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কেউ যদি অবৈধ মাদক উৎপাদনের চেষ্টা করেন, তাহলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে মাদক সরবরাহ ও সম্ভাব্য বিক্রয় নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় নাজমুলের কাছে রাসায়নিক উপাদানগুলো কীভাবে পৌঁছেছে, কারা তাঁকে এসব সরবরাহ করেছে এবং উৎপাদিত মাদক বাজারজাত করার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়।
বাংলাদেশে ইয়াবা উৎপাদন, সংরক্ষণ, বহন ও বিক্রয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধের ধরন ও সংশ্লিষ্ট মাদকের পরিমাণ অনুযায়ী আইনে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট কোনোভাবেই মাদক উৎপাদনের মতো অপরাধের বৈধতা দেয় না। টঙ্গীর এ ঘটনায় উদ্ধার করা আলামত, জব্দ করা রাসায়নিক উপাদান এবং অভিযুক্তের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।


