খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫
নাদিয়া নাদিমের জীবনের গল্পটা যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। আফগানিস্তানে তালেবানদের হাতে বাবাকে হারিয়ে মাকে নিয়ে চার বোনসহ দেশ ছাড়েন তিনি। মাত্র ১১ বছর বয়সে ভয়াবহ এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন নাদিয়া। আফগানিস্তানে পিতৃহীন হয়ে, তার পরিবারের ছয়জন নারী সদস্য মিলে পেছনের দরজা দিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমান। ট্রাকের পেছনে লুকিয়ে পাড়ি জমানোর পথে লন্ডনের বিগ বেন দেখার স্বপ্ন থাকলেও, শেষমেশ ঠাঁই হয় ডেনমার্কের একটি শরণার্থী শিবিরে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় নাদিয়ার নতুন জীবনের পথচলা। জীবনে প্রথম ফুটবলের সঙ্গে পরিচয়—যেটি পরবর্তীতে হয়ে ওঠে তার মুক্তির পথ, স্বপ্নপূরণের হাতিয়ার।
আজ নাদিয়া নাদিম শুধুই একজন সফল ফুটবলার নন। তিনি একশ’র বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ডেনিশ তারকা, একজন প্রশিক্ষিত সার্জন, ইউনেস্কোর শুভেচ্ছাদূত এবং লক্ষ লক্ষ মেয়ের অনুপ্রেরণা।
১৯৮৮ সালের ২ জানুয়ারি আফগানিস্তানের হেরাতে জন্ম নেওয়া নাদিয়ার জীবনে শিশুকালেই নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। যখন তিনি মাত্র ১১, তখন তালেবানরা হত্যা করে তার বাবা হামিদ নাদিমকে—যিনি ছিলেন আফগান সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল। এরপর শুরু হয় পালানোর যাত্রা। তার মা হামিদা নাদিম এবং চার বোনকে নিয়ে ভুয়া পাসপোর্টে তারা আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান হয়ে ইতালিতে পৌঁছান। সেখান থেকে ট্রাকে করে তাদের গন্তব্য ছিল লন্ডন। কিন্তু সেই ট্রাক থেমে যায় ডেনমার্কে—যেখানে তারা দেখতে চেয়েছিলেন বিগ বেন, সেখানে পেয়েছিলেন বনভূমি।
সেই বনজ পথ পেরিয়ে ডেনমার্কের একটি শরণার্থী শিবিরেই শুরু হয় নাদিয়ার নতুন জীবন। সেখান থেকেই ফুটবলের সঙ্গে তার পরিচয়, যা পরবর্তীতে তাকে নিয়ে গেছে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় ক্লাবে। খেলেছেন ম্যানচেস্টার সিটি, প্যারিস সাঁ জার্মেই ও এসি মিলানের হয়ে। ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো ডেনমার্ক জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামেন। তারপর শতাধিক ম্যাচে অংশ নিয়ে করেছেন ৩৮ গোল। ২০১৭ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তার করা গোল ছিল ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
তবে শুধু মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও নাদিয়া নাদিম এক বিস্ময়। আরহুস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন চিকিৎসাশাস্ত্র। ফুটবল মৌসুম চলাকালে দূরশিক্ষার মাধ্যমে ক্লাস করেছেন। ২০২২ সালে তিনি একজন যোগ্য সার্জন হিসেবে চিকিৎসা ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০২০ সাল থেকেই অপারেশনে সহায়তা করছিলেন।
নাদিয়া একাধারে ইউনেস্কোর শুভেচ্ছাদূত, নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক এবং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের রোল মডেল। আটটি ভাষায় পারদর্শী এই মুসলিম নারীকে ২০১৮ সালে ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিন ‘আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের ২০ জন সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী’র তালিকায় স্থান দেয়। ২০২৪ সালে ইতালির দৈনিক ‘কোরিয়েরে দেল্লা সেরা’ তাকে নির্বাচিত করে ‘বর্ষসেরা নারী’-এর তালিকায়।
তার এই দীর্ঘ পথে ছিল অসংখ্য ত্যাগ আর বেদনার গল্পও। ২০২২ সালের নভেম্বরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার মা হামিদা মারা যান। কাতার বিশ্বকাপে ডেনমার্ক-তিউনিসিয়ার ম্যাচে ধারাভাষ্য দেয়ার সময় খবর পেয়ে সরাসরি স্টুডিও ছেড়ে বেরিয়ে আসেন নাদিয়া।
২০২৪ সালের ৯ আগস্ট দীর্ঘদিনের সঙ্গী ইদরিসকে বিয়ে করেন ইস্তাম্বুলে। বিয়েতে গান পরিবেশন করেন তার খালা, প্রখ্যাত আফগান গায়িকা আরিয়ানা সাঈদ।
তবে নাদিয়ার জন্য কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যই শেষ কথা নয়। পিএসজি ও ক্লাবু (KLABU) নামে একটি দাতব্য সংস্থার সঙ্গে কাজ করছেন, যারা বিশ্বজুড়ে শরণার্থী শিবিরে খেলার সুযোগ তৈরি করে। ২০২৫ সালের সকার এইড (Soccer Aid)-এ অংশ নিয়ে বলেন, ‘আমি সেসব নারীর প্রতিনিধিত্ব করতে চাই, যাদের কোনো কণ্ঠস্বর নেই।’ শুধু আফগান নারীর জন্য নয়, সারা বিশ্বের নারীদের জন্য তার অবস্থান এক নতুন আশার প্রতীক।
নাদিয়া নাদিমের গল্প আমাদের দেখায়, প্রতিকূলতা থেকে ঘুরে দাঁড়ালে কীভাবে সম্ভব হয় অসম্ভবকে জয় করা। যুদ্ধ, মৃত্যু, শরণার্থীজীবন—সব পেরিয়ে আজ তিনি বিশ্ব ফুটবলের মুখ। আর কোটি নারীর কাছে তার বার্তা একটাই—‘স্বপ্ন দেখো, আর লড়াই করো। কারণ সুযোগ সব সময় আসে না, কিন্তু আসলে তা কাজে লাগাতে জানতে হয়।’ নাদিয়া নাদিম আমাদের মনে করিয়ে দেন—সংঘাত, শরণার্থী জীবন কিংবা সমাজের চোখরাঙানি কোনো কিছুই একজন নারীর স্বপ্ন থামিয়ে রাখতে পারে না।
খবরওয়ালা/এন