খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ জুলাই ২০২৫
চার দশক আগে স্থাপিত লিফট। নেই সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ। ফ্যান নেই, আলো নিভে যায় মাঝপথে, নিয়মিত আটকে পড়ে। কোনো দিন ৫ মিনিট, কোনো দিন আধা ঘণ্টা।
আটকে পড়া মানুষের কণ্ঠে আতঙ্ক—“ভাবছিলাম, লাশ হয়ে ফিরব।” বলছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফটের কথা। এই লিফট যেন এখন রোগী ও স্বজনদের জন্য মরণফাঁদ।
হাসপাতালের ১৬টি লিফটের মধ্যে ৩টি বহুদিন ধরে অচল। বাকি ১৩টি সচল থাকলেও নিয়মিতই ত্রুটির শিকার। মাঝে মাঝেই হঠাৎ লিফট আটকে যায়—তাতে থাকে রোগী, স্বজন, হাসপাতাল কর্মী এমনকি শিশুও। বিদ্যুৎ না থাকলে বন্ধ হয়ে যায় বাতাস চলাচল, অন্ধকারে পড়ে শ্বাসরুদ্ধ পরিস্থিতি।
গত কয়েক দিনে অন্তত চারজন রোগীর স্বজন এবং দুইজন কর্মচারী এই আতঙ্কজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা। তাদের মধ্যে একজন, যিনি সম্প্রতি স্ত্রীকে দেখাতে এসে আটকে পড়েছিলেন হাসপাতালের ৫ নম্বর ভবনের লিফটে, বলেন,“আলো নিভে গিয়েছিল। ফ্যান ছিল না। ভিতরে গরমে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ফোনে আলো জ্বেলে বসে ছিলাম। ভাবছিলাম বের হতে পারব না।”
একজন নারী কর্মচারী বলেন,“আমার সাথে একজন রোগীর মেয়ে ছিল। হঠাৎ লিফট বন্ধ হয়ে গেল। মেয়েটা কাঁদতে শুরু করল। আমিও ভয় পেয়ে গেলাম। এই লিফটে আগেও দু-বার আটকে পড়েছি।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“লিফটগুলো চার দশকের পুরোনো। বেশ কয়েকবার গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দিয়েছি। তারা বলেছে নতুন লিফট দেওয়ার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, তবে এখনও কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফটগুলো দেখভাল করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগ। এই সংস্থার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ফাহমিদ ইফতেখার আলীর বলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬টি লিফট রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি লিফট একেবারে নষ্ট। এগুলো ৪ বছরের বেশি সময় ধরেই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এগুলোকে ঠিক করার আর কোনো উপায় নেই। এগুলো পরিবর্তন করতে হবে।
নষ্ট তিনটি লিফট নতুন করে বসানোর জন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। যেহেতু লিফটগুলো লাগানো সম্ভব হয়নি, তাই এ বছর আবারও চাহিদাপত্র পাঠানো হবে। বাকি ১৩টি লিফট সচল থাকলেও বিভিন্ন সময় অভিযোগ আসে। সচল লিফটগুলোর অধিকাংশই ভুল ব্যবহারের কারণে বাটন নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে।
জানা গেছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লিফট মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মেসার্স নাঈমা এন্টারপ্রাইজ ৩০ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছে। পরে গণপূর্ত অধিদপ্তর ময়মনসিংহ দপ্তরের মাধ্যমে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। এখন আবেদনকারীদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। ১ আগস্ট থেকে নতুনভাবে কাউকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হবে।
প্রকৌশলী ফাহমিদ ইফতেখার আলীর মতে, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য রোগীদের সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে আরও ৫-৬টি নতুন লিফট সংযোজন করা প্রয়োজন। রোগীভর্তি লিফট বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখনও কেউ এ ব্যাপারে আমাদের কাছে অভিযোগ করেননি। তবুও স্বপ্রণোদিত হয়ে আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখব।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলামের ভাষ্য, লিফট নষ্ট হওয়া এবং আটকে যাওয়া নিয়ে রোগীর স্বজনরা বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গণপূর্ত বিভাগকে বারবার জানানো হয়েছে। শুধু রোগী নন, চিকিৎসকরাও এই লিফট ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এর স্থায়ী সমাধান দরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিফট এমন একটি স্পর্শকাতর যন্ত্র যা প্রতিদিন পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। নিয়মিত ‘সেফটি চেক’ না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।
খবরওয়ালা/আশ