খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 29শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ১৩ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন সারা বিশ্বের মুক্তিকামি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। উনি প্রচন্ড ভালোবাসতেন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানকে।
আজ ফিদেল কাস্ত্রো’র ৯৯ তম জন্মদিন। ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর একটি ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হ’লো
স্বাধীন দেশের ‘আমলাতন্ত্র’ নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সতর্ক করেছিলেন কিউবার অবিসংবাদিত বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। ১৯৭৩ সালে আফ্রিকার আলজিয়ার্স নগরীতে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনের শেষপর্যায়ে এই দুই মহান নেতার সৌজন্য সাক্ষাতের বর্ণনায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ওই সময় বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মরহুম এম.আর. আখতার মুকুল সেই সাক্ষাতের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তার ‘মুজিবের রক্ত লাল’ বইতে মুজিব-কাস্ত্রোর কথোপকথন তুলে ধরেন।
খবরওয়ালা’র পাঠকদের জন্য এম.আর. আখতার মুকুল রচিত বই থেকে কথোপকথনটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
কাস্ত্রো : এক্সেলেন্সি, আপনি বোধ হয় চিলির বিপ্লবী প্রেসিডেন্ট আলেন্দের সর্বশেষ অবস্থার কথা অবগত আছেন। বিদেশি ষড়যন্ত্রে তার সরকারের পতন এখন যেকোনো মুহূর্তে হতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে, এই মহান বক্তিত্বকে ধরাধাম থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। এক্সেলেন্সি, এ ধরনের এক প্রেক্ষাপটে আপনাকে অত্যন্ত আপনজন মনে করেই আজ কয়েকটি কথা বলব। এজন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
মুজিব : এক্সেলেন্সি, আপনি নির্ভয়ে এবং সরল মনেই কথা বলতে পারেন। আমি জানি যে, আপনি হচ্ছেন আমাদের অকৃত্রিম শুভাকাঙ্ক্ষী এবং বন্ধু।
কাস্ত্রো : বাংলাদেশ এবং ভারত থেকে আমরা যেসব খবর পাচ্ছি, তাতে এই দুটো দেশের অবস্থা খুব একটা সুবিধার মনে হচ্ছে না। দুটো দেশেই সাম্রাজ্যবাদী এজেন্টরা খুবই তৎপর।
মুজিব : এক্সেলেন্সি, এত ভূমিকা না করে আসল কথা বললে আমি খুশিই হব। বেয়াদবি নেব না।
কাস্ত্রো : এক্সেলেন্সি, তাহলে শুনুন। চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দের মতো আমরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মুজিবকেও খরচের খাতায় রেখে দিয়েছি। ইউ আর ফিনিশ এক্সেলেন্সি (আপনিও শেষ এক্সেলেন্সি)।
মুজিব : কমরেড, হঠাৎ করে এ ধরনের কথাবার্তা বলছেন কেন? একটু গুছিয়ে বলবেন কি?
বিকজ, ইউ হ্যাভ লিগালাইজড দ্য ডিফিটেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইন বাংলাদেশ। ইউ আর ফিনিশ এক্সেলেন্সি।
(কেননা, আপনি বাংলাদেশে একটা পরাজিত প্রশাসনকে আইনসঙ্গত করেছেন। এক্সেলেন্সি, আপনি কিন্তু নিশ্চিতি হচ্ছেন না?)
কাস্ত্রো : বিকজ, ইউ হ্যাভ লিগালাইজড দ্য ডিফিটেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইন বাংলাদেশ। ইউ আর ফিনিশ এক্সেলেন্সি। (কারণ, আপনি বাংলাদেশে একটা পরাজিত প্রশাসনকে আইনসঙ্গত করেছেন। এক্সেলেন্সি, আপনি কিন্তু নিশ্চিহ্ন হতে যাচ্ছেন।)
মুজিব : এক্সেলেন্সি, আপনি জানেন যে, আমাদের বাংলাদেশ আয়তনে একটি ক্ষুদ্র দেশ এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঝানু ‘ব্যুরোক্রেট’দের প্রয়োজন। এজন্যই আমি পাকিস্তানি আমলের অভিজ্ঞ অফিসারদের চাকরির ধারাবাহিকতা দিয়ে বাংলাদেশের প্রশাসনে বসিয়েছি।
কাস্ত্রো : বেয়াদবি নেবেন না এক্সেলেন্সি। এদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কথা বলছেন? ফুঃ? হোয়াট এক্সপিরিয়েন্স দে হ্যাভ গট? উইথ দেয়ার এক্সপিরিয়েন্স অ্যান্ড অ্যাডভাইস মাইটি পাকিস্তান লস্ট ইন দ্য ওয়ার। ইয়োর মুক্তি বয়েজ? নো এক্সপিরিয়েন্স। ফাইটিং, ফাইটিং অ্যান্ড ফাইটিং, গট ভিকটরি।
(ফুঃ এদের কী অভিজ্ঞতা আছে? এসব অভিজ্ঞতা এবং পরামর্শের জন্যই তো যুদ্ধে শক্তিশালী পাকিস্তান পরাজিত হয়েছে। আপনার মুক্তিযোদ্ধা ছেলেরা? কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। লড়াই, লড়াই আর লড়াই করে বিজয় তারা এনেছে।)
মুজিব : তাহলে আমরা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে পুনর্গঠনের কাজ করব কীভাবে?
কাস্ত্রো : “ব্রিং লইয়ার্স, ব্রিং জার্নালিস্টস, ব্রিং বিজনেস এক্সিকিউটিভস, ব্রিং ডক্টরস, ব্রিং ইঞ্জিনিয়ার্স, ব্রিং প্রোফেসার্স অ্যান্ড পুট দেম অন টপ অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। দে উইল ডু মিসটেক, মিসটেক অ্যান্ড লার্ন—বাট নট কন্সপিরেসি। ফর গড সেক। প্লিজ গিভ মোর রেসপন্সিবিলিটি টু ইয়োর মুক্তি বয়েজ অ্যান্ড ফুললি ট্রাস্ট দেম। আদারওয়াইজ, ইউ আর ফিনিশ এক্সেলেন্সি.”
(অর্থাৎ, আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী কর্ত্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদদের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দিন। এরা ভুল করে শিখবে—কিন্তু ষড়যন্ত্র করবে না। দয়া করে মুক্তিযোদ্ধা ছেলেদের আরও বেশি দায়িত্ব দিন এবং পুরোপুরি তাদের উপর নির্ভর করুন, নইলে আপনি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন।)
মুজিব : করমেড, সত্যি কথা বলতে কি, গুটি কয়েক আঙ্গুলে গোনা কোলাবরেটর অফিসার ডিসমিস করে বাকি অভিজ্ঞ অফিসারদের সিনিয়রিটি দিয়ে আমি দায়িত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছি। আমার তো এতদিনের ধারণা ছিল যে, এদের অভিজ্ঞতা কাজে আসবে। কিন্তু আপনার কথায় আমি চিন্তিত হয়ে পড়েছি।
কাস্ত্রো : এক্সেলেন্সি, দুনিয়ার কোথাও যুদ্ধে পরাজিত প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পুনর্গঠনমূলক প্রশাসনে আর দায়িত্ব দেওয়া হয় না। বাংলাদেশে আপনার মহানুভবতায় তারা বাঁচেছেন—এটাই যথেষ্ট। যুদ্ধোত্তর দেশে এ ধরনের অফিসার পুনর্বাসন প্রশ্নই আসে না। দেখুন না, সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রেও ক্ষমতাসীন দলের পরাজয় হলে, উচ্চপদস্থ কর্মচারী এমনকি রাষ্ট্রদূতদেরও বিদায় নিতে হয়।
মুজিব : এক্সেলেন্সি প্রেসিডেন্ট কাস্ত্রো, আমার একমাত্র চিন্তা হলো, বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে কীভাবে দ্রুত পুনর্গঠন করা সম্ভব।
“ব্রিং লইয়ার্স, ব্রিং জার্নালিস্টস, …” (উপরোক্ত বাক্যাবলী পুনরাবৃত্তি)
কাস্ত্রো : এক্সেলেন্সি, তাহলে কিউবার দৃষ্টান্ত দিচ্ছি—মহান বিপ্লবের পর চে গেভারা কিউবার পরাজিত প্রশাসনকে নিশ্চিহ্ন করে একেবারে নতুন করে গঠন করেন। আজকের দিনে কিউবা থেকে বাতিস্তার প্রশাসনের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। এজন্যই, কিউবার প্রতিবেশী শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও আমার বিরোধিতায় কোনো ষড়যন্ত্র সফল না হয়েছে। পশ্চিম গোলার্ধের মানচিত্রে দেখুন—মায়ামি বিচ থেকে কিউবার দূরত্ব মাত্র ৯০ মাইল, তবুও কিউবা প্রফুল্লভাবে তার অস্তিত্ব রক্ষা করেছে। দেখতে পাচ্ছেন আমার দেহরক্ষীরা—তাদের কিনে ফেলা যাবে না। কোনো মূল্যে তাদের কেনা সম্ভব নয়।)
মুজিব : এক্সেলেন্সি, দয়া করে থামবেন না। আপনার কথায় আমার ষড়যন্ত্র-সম্পর্কিত জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত হচ্ছে।
কাস্ত্রো : (দর্শাতে ইঙ্গিত করে) দয়া করে চেষ্টা করুন তাদের কেনার—তোমাকে অফার করো লাখে লাখে ডলার… ঠিক আছে, একটি মিলিয়ন ডলার অফার করো। কিন্তু তুমি তাদের কিনতে পারবে না। দীর্ঘ যুদ্ধকালে আমরা একই ব্যাংক ব্যবহার করেছিলাম, খাবার-বিছানা সব ভাগ করেছি। তুমি ধারণা কিনা কতোটা ভালোবাসে আমাকে। আমি সিগারেট খাই, আমার ছেলেরা প্রথমে চুরুট খাে। দুজন মৃত্যু হয় সিআইএ-র বিষে। এক্সেলেন্সি, আপনি বাংলাদেশে কাদের বিশ্বাস করেছেন? আপনি কি আলেন্দের মতো নিশ্চিহ্ন হবে?
কাস্ত্রো : “কমরেড মুজিব, আই লাভ ইউ—আই লাভ ইউ। আই লাভ বাংলাদেশ।”
সবার চোখ তখন অশ্রুসজল।
বিদায়ের পালা শুরু হলো। হাতের একটু দগ্ধ চুরুট অ্যাশটেই রাখলেন কাস্ত্রো। ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর নিকটে এগিয়ে এলেন, উষ্ণ আলিঙ্গনে পরস্পর চুম্বন—শেষে কাস্ত্রো মুজিবের কাঁধে মাথা রেখে হাঁফ ফেললেন:
‘কমরেড মুজিব, আমি তোমায় ভালোবাসি—আমি তোমায় ভালোবাসি। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি।’
বারান্দায় রাখা বড় লিমোজিনে ওঠার সময় হঠাৎ মাথা একটু বাঁকিয়ে কাস্ত্রো ঘোষণা করলেন: ‘জয় বাংলা’।
খবরওয়ালা/এমএজেড