খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সংস্কার ও গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় জোর দেওয়ায় নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। সরকার বারবার বলছিল, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পরেই নির্বাচন আয়োজন করা হবে। এই অবস্থানে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়, যা সরকারকেও ব্যতিব্যস্ত করে তোলে।
এই পরিস্থিতি বদলে যায় লন্ডনে ১৩ জুন অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের পর। ওই বৈঠক শেষে যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, আগামী বছরের জানুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই ঘোষণার পর নির্বাচন নিয়ে তৈরি হওয়া গুজব-গুঞ্জন অনেকাংশে কমে যায়। যদিও জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া দেখায়।
লন্ডন বৈঠকের দুই মাসেরও বেশি সময় পর নির্বাচন কমিশন গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশ করে। এই রোডম্যাপ অনুযায়ী, ডিসেম্বরের প্রথমে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে এবং ভোটগ্রহণ হবে ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে। রোডম্যাপ প্রকাশের পর নতুন করে গুজব ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে, যা রাজনীতির মাঠে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা এই অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কাকরাইলে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষে নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাচন পেছানো বা ব্যাহত করার জন্য এই হামলা করা হয়েছে কিনা। এছাড়াও, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার পেছনে কোনো পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
এর মধ্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রধান বিচারপতি, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এসব সাক্ষাতের পর সেনাপ্রধান গুজব নিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করেন এবং বলেন, সেনাবাহিনী সরকারের সব উদ্যোগ সফল করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রধান উপদেষ্টার তরফেও বলা হয়, সরকার যথাসময়ে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলও নিশ্চিত করেছেন যে, ঘোষিত সময় অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা পেছানোর কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে, নির্বাচন নিয়ে সরকার ঘোষিত সময়ের বিষয়ে বিএনপি ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও, অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকটি দলের ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। জামায়াত পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং এনসিপি নতুন করে সংবিধান পরিবর্তনের জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দুই পক্ষের ভিন্ন অবস্থানের কারণে আওয়ামী লীগ সমর্থিত পক্ষগুলো গুজব ছড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি’র সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকের পর সরকার নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন করতে চায় বলে বিএনপি আশ্বস্ত হয়েছে। তবে জামায়াত ও এনসিপি তাদের ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছে। তারা জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করারও দাবি তুলেছে।
জাপা ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষের পর নতুন করে জাতীয় পার্টি আলোচনায় এসেছে। কেউ কেউ বলছেন, অদৃশ্য শক্তি জাপাকে সামনে এনে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। এই আলোচনা অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনকে ঘিরে অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে এবং কিছু রাজনৈতিক দল তাদের দলীয় স্বার্থে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসিরউদ্দিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে জানিয়েছেন, নির্বাচনের সময় ‘মব’ বা জনসমাবেশ বিভক্ত হয়ে যাবে, ফলে মব-এর ঘটনা তেমন প্রভাব ফেলবে না। তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নির্বাচনকালীন সময়ে মবের ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু এর মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
খবরওয়ালা/টিএসএন