খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন না ফেরার দেশে চলে গেছেন। প্রখ্যাত আধুনিক গানের শিল্পী কনকচাঁপা শেষবারের মতো তাকে দেখতে রাতেই হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। একইসঙ্গে শিল্পীদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্যের বিষয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেন কনকচাঁপা। তার মতে, ‘ফেসবুক যেন মাওলানা দিয়ে ভর্তি।’
ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ফরিদা পারভীন আপা লালনগীতির যে জনপ্রিয়তা তৈরি করেছিলেন, সেই জায়গাটা আসলে তিনি পুরোটাই শূন্য করে নিজের সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন। কারণ আধুনিক সমাজে আমরা যারা লালনের গান শুনতাম, একমাত্র ফরিদা আপাকেই শুনতাম। যারা লালন সাঁইজির আখড়ায় গান করেন, তাদের গান একরকম; কিন্তু ফরিদা আপা ওখান থেকে লালনের গানটা তুলে এনে আধুনিকায়ন করে আমাদের কাছে উপস্থাপন করেছেন।’
শিল্পীর গায়কীর প্রশংসা করে কনকচাঁপা আরও বলেন, ‘উনার কণ্ঠে যে মায়া, শুধু লালনসংগীত কেন বলব? তিনি দেশের গান কিছু গেয়েছেন—‘এই পদ্মা এই মেঘনা এই যমুনা সুরমা নদী তটে’সহ আরও কিছু। কিছু আধুনিক গান গেয়েছেন, তা অতুলনীয়। আমি যদি উদাহরণস্বরূপ বলি ‘তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকা দি’র নাম’—এই গান অনবদ্য। উনার কণ্ঠ অনবদ্য, উনার সুর একদম তীরের মতো সোজা অন্তরে এসে লাগে। এসব স্মৃতিচারণ করতে গেলে আমি আসলে এখন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছি।’
সঙ্গীতাঙ্গনে একের পর এক কিংবদন্তির প্রয়াণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘সত্যি সত্যি আমরা অনেককেই হারিয়ে ফেলছি। সংগীতাঙ্গনে আমাদের মাথার উপর যারা বটবৃক্ষের মতো ছিলেন তাদের প্রায় সবাইকে হারাচ্ছি। আমি যে ভরাট একটি সংগীতাঙ্গন দেখে বড় হয়েছি, ঋদ্ধ হয়েছি, তারমধ্যে অনেককেই হারিয়ে ফেলেছি। আজকে ফরিদা আপাও চলে গেলেন। আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।’
সাংবাদিকদের উদ্দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে কনকচাঁপা বলেন, ‘দয়া করে আমার কথাগুলো কাটবেন না, সবাইকে প্রচার করার জন্য অনুরোধ করছি একটা কথা। সাধারণ জনগণ নিজেদের সময়ে আনন্দময় করতে গান শোনেন, সিনেমা-নাটকে অভিনয় দেখেন। কিন্তু একজন শিল্পী মারা গেলে মানুষ পাপ-পুণ্য, বেহেশত-দোজখ নিয়ে এত কথা বলে যে এগুলো পড়লে আমরা ভীত হয়ে যাই। আমরা খুব ভেঙে পড়ি, খারাপ লাগে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘একজন শিল্পী মারা যাওয়ার পর তার লাশ দাফনের আগেই তিনি দোজখের কয় নাম্বারে যাবেন, তা নিয়ে কথা বলা শুরু হয়। অথচ সারাজীবন কিন্তু তারাই আমাদের গান শোনেন। সাধারণ মানুষ যারা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন, তাদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ—আমাদের শিল্পীদের এত পাপী ভাববেন না। পাপ আমাদের দেশে আরও অনেক জায়গাতেই আছে। শিল্পীরা শুধু গানই করেন। শিল্পীরাই একমাত্র জাতি যাদের ঘুষ খাওয়ার জায়গা নাই, দুর্নীতি করার জায়গা নাই, মিথ্যাচার করার জায়গা নাই, অন্যায় করার জায়গা নাই। অথচ আমরা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কয় নম্বর দোজখে যাবো মানুষ তা নির্ধারণ করে ফেলে। একদম বেহেশতের টিকিট যেন সবার হাতে! মাওলানা দিয়ে ভর্তি যেন ফেসবুক। সত্যি আমি আবেগপ্রবণ হয়ে অনেক অপ্রিয় সত্যি কথা বলে ফেললাম। আপনারা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, শিল্পীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন।’
খবরওয়ালা/শরিফ