খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ছিলেন জাতীয় পার্টির (এরশাদ) কেন্দ্রীয় নেতা। সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেয়ে যোগ দেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিতে (মুকিত-জাফর)। সেখান থেকে কাঁঠাল প্রতীকে নির্বাচন করেন। তবে সেই দলে টিকতে পারেননি তিনি। সবশেষে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিত তৃণমূল বিএনপি থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেন।
বারবার দলবদল করা এই নেতা হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এম. শাব্বির আহমেদ। সম্প্রতি তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নড়াইল জেলা প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এ পদে নিয়োগ নিয়ে স্থানীয় এনসিপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ না থাকায় বহিষ্কৃত ও দলছুট নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত হয় তৃণমূল বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের বহিষ্কৃত উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার এবং মহাসচিব ছিলেন বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী। সেসময় এম. শাব্বির আহমেদ যশোর-৪ আসন থেকে তৃণমূল বিএনপির হয়ে সোনালী আঁশ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র এক হাজার ৬৬৬ ভোট পান। এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি থেকে কাঁঠাল প্রতীকে প্রার্থী হয়ে তিনি মাত্র ৭৪২ ভোট পেয়েছিলেন।

একসময় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন শাব্বির আহমেদ। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি জাপা থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু মনোনয়ন না পেয়ে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি থেকে অংশ নেন।
শাব্বির আহমেদ মূলত যশোরের অভয়নগর উপজেলার বাসিন্দা। যদিও তিনি দাবি করেন, তার বাড়ি নড়াইল সীমান্তের খুব কাছেই, সেখানে তাদের জমিজমা ও ব্যবসাপাটিও আছে। তবু যশোরের বাসিন্দাকে নড়াইল জেলা এনসিপির দায়িত্ব দেওয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা ও হাস্যরস ছড়িয়েছে।
বারবার দলবদলকারী শাব্বির আহমেদকে নড়াইল জেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী করার ঘটনায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। জুলাই আন্দোলনে আহত ও এনসিপি কর্মী মো. মাসুম বিল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, নড়াইল জেলায় কি নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য কেউ নেই যে বাইরের একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে আনতে হলো?
কমিটি গঠনের পর থেকেই নড়াইল জেলা এনসিপির সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, প্রধান সমন্বয়কারী শাব্বির আহমেদ ঢাকায় চাকরির কারণে এলাকায় থাকেন না, ফলে কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়তা তৈরি হয়েছে। গত ৩ জুন জেলা কমিটি ঘোষণার পর তিনি নড়াইলে মাত্র কয়েকবার এসেছেন। অভিযোগ আছে, ঈদের সময় পাঁচ-ছয় দিন এলাকায় থাকলেও তিনি দলের কোনো নেতাকর্মীর খোঁজ নেননি। ১০ জুলাই এনসিপির কেন্দ্রীয় টিম নড়াইলে এলে তিনি মাত্র একদিন অংশ নেন, তারপর ঢাকায় ফিরে যান। স্থানীয়দের দাবি, অল্প কয়েকজন ছাড়া কারও সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ নেই। দলীয় কার্যালয়ও নেই নড়াইল শহরে।
কালিয়া উপজেলা শাখা এনসিপির সমন্বয় কমিটির সদস্য নাজমুল হাসান উজ্জ্বল বলেন, একজন চাকরিজীবী কীভাবে জেলার প্রধান সমন্বয়কারী হন? যদি ব্যবসায়ী হতেন, তাহলে অন্তত নিজের মতো সময় বের করে এলাকায় থাকতে পারতেন। চাকরিজীবী হয়ে এ দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, কমিটি গঠনে ত্যাগী জুলাই আন্দোলনকারীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। অনেক আহত আন্দোলনকারী বাদ পড়েছেন বা নিচু পদে রাখা হয়েছে। যেমন, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় নারী নেত্রী সামিরা খানম কোনো পদ পাননি। আহত আন্দোলনকারী এস এম ইরফানুল বারী উজ্জ্বল ২১ সদস্যের কমিটিতে ১২ নম্বরে রয়েছেন। নড়াইল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও জুলাই আহত আ. রহমান মেহেদীও পদ পাননি। তুহিন বিন আব্দুর রাজ্জাক, মো. শুভ মোল্যা, নবাব মোল্যা, আমিরুল ইসলাম রানা ও নুসরাত জাহানের মতো আন্দোলনকারীরাও জায়গা পাননি। বরং শাব্বির আহমেদের ছত্রছায়ায় জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা অ্যাডভোকেট ইমদাদুল হক ও আবুল হাসান চঞ্চল কমিটিতে স্থান পেয়েছেন।
আ. রহমান মেহেদী বলেন, ‘নড়াইলের এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী হয়েও শাব্বির আমাদের খোঁজ নেন না। ফোনেও তাকে পাওয়া যায় না। তিনি নড়াইলে আসেন না। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে তিনি ছিলেন জাপার কেন্দ্রীয় নেতা, আবার হাসিনার ডামি নির্বাচনে কিংস পার্টির প্রার্থী। এমন একজন কলঙ্কিত ব্যক্তি বিপ্লবোত্তর সময়ে এসেও কীভাবে বিপ্লবী দল এনসিপির জেলা প্রধান হলেন?’
যোগাযোগ করা হলে এম. শাব্বির আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তার অংশগ্রহণ ছিল গোয়েন্দা সংস্থার চাপের ফল। তার দাবি, গোয়েন্দাদের বৈঠকে তাকে বলা হয়, জাতীয় পার্টি শেষ হয়ে গেছে, তাই তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দিতে। তারা আশ্বস্ত করেন, ৩৩ আসন পাবে তৃণমূল বিএনপি এবং বিরোধী দলে পরিণত হবে। ‘এ নির্বাচন ছিল আমার ওপর এক ধরনের জোরাজুরি। নির্বাচনের পরদিনই আমি তৃণমূল বিএনপি থেকে পদত্যাগ করি।’

২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে শাব্বিরের অভিযোগ, তাকে এরশাদ আগেই মনোনয়ন দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগে এরশাদ অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুর চলে গেলে মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার টাকা খেয়ে অন্যকে মনোনয়ন দেন। পরে এরশাদ ও জিএম কাদের তাকে নির্বাচন করার পরামর্শ দেন। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর ও তথ্য সংগ্রহের জটিলতার কারণে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি থেকে কাঁঠাল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানান, তার নিজস্ব চিন্তা আছে, তবে দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। যদিও ইঙ্গিত দেন, নড়াইল-১ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা আছে।
এ বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ও নড়াইল জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি মোল্যা রহমাতুল্লাহ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার খুব বেশি জানা নেই। কমিটি করার আগে কিছুটা খোঁজ নিয়েছি। শুনেছি, তিনি আগে জাতীয় পার্টিতে ছিলেন, পরে ছেড়েছেন। এর বাইরে আর কিছু জানি না।’
খবরওয়ালা/এন