খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে ঢাকের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। দুর্গাপূজা, চণ্ডীপাঠ কিংবা সামাজিক উৎসব—ঢাকের বাজনা ছাড়া বাঙালির আনন্দ-উৎসব যেন কল্পনাই করা যায় না। আর এই ঢাকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার এক অনন্য আয়োজন—দেশের একমাত্র ঢাকের হাট, যার বয়স আজ প্রায় পাঁচ শত বছর।
স্থানীয় ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রায় ৫০০ বছর আগে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী জমিদার পরিবারের উদ্যোগে এই হাটের সূচনা হয়। পূজা-পার্বণ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ঢাকের প্রয়োজন মেটাতে এ হাট গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে ঢাক তৈরির কারিগর ও বাজনাদারেরা এখানে সমবেত হতে শুরু করেন। তাঁদের হাতে তৈরি ঢাক ক্রয় করতে আসতেন দূর-দূরান্ত থেকে পূজারি ও মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ। এভাবেই কালের পরিক্রমায় হাটটি এক অনন্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
প্রতি বছর দুর্গাপূজার আগে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এ হাট বসে। মেলা সদৃশ এই হাটে সাজানো থাকে সারি সারি ঢাক। গরু কিংবা ছাগলের চামড়া দিয়ে তৈরি প্রতিটি ঢাকের ভেতর বাজে আলাদা সুর। বিক্রির পাশাপাশি কারিগররা এখানে প্রদর্শনও করেন ঢাক তৈরির নানা ধাপ—কাঠ কেটে গোল ফ্রেম বানানো, চামড়া টান দিয়ে বাঁধা, তারপর বাজিয়ে সুর ঠিক করা—সবই দেখা যায় চোখের সামনে।
শুধু কেনাবেচা নয়, এ হাট ঢাকিদের মিলনমেলাও বটে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ঢাকিরা এখানে নিজেদের ঢাক বেছে নেন এবং সুর মিলিয়ে প্রতিযোগিতা করেন। কার ছন্দ বেশি মনোমুগ্ধকর, কার আওয়াজ গভীর—তা দেখার জন্য ভিড় করেন হাজারো মানুষ। ঢাকের তালে-তালে নেচে ওঠে হাটের পরিবেশ, তৈরি হয় উৎসবমুখর আবহ।
বাদ্যযন্ত্র বাদকেরা অর্থের বিনিময়ে কেবল পূজা চলাকালীন আয়োজকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। পূজা শুরুর আগে দরদাম ঠিক করে বায়নার টাকা দিয়ে বাদ্যযন্ত্রসহ যন্ত্রীদের সঙ্গে করে নিয়ে যান পূজার আয়োজকরা। কার চুক্তিমূল্য কত হবে, তা নির্ধারণ হয় ঢাকিদের দক্ষতার ওপর।
ঢাকিরা জানান, একেকজন ঢাকী ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার, বাঁশিবাদক ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছেন। আর ছোট ব্যান্ডদল ১৫ হাজার থেকে ২০ এবং ৭/৮ জনের বড় দল ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় চুক্তি পাচ্ছেন।
ঢাকের হাটে বাহারি রং আর আকারের ঢাক-ঢোল, বাঁশি, কাঁসি, খোলসহ অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের পসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। বাদ্যযন্ত্রসহ যন্ত্রীরা এসেছেন ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে।
জনশ্রুতি আছে, ষোলো শতকের মাঝামাঝি রাজা নবরঙ্গ রায় চৌধুরী চারিপাড়ার রাজপ্রাসাদে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। সেখানে ঢাক, ঢোল, বাঁশিসহ অন্যান্য যন্ত্রসহ অংশ নিতে খবর পাঠানো হয় বিক্রমপুর পরগনায় যন্ত্রীদের কাছে। বিক্রমপুর থেকে আসা যন্ত্রীরা পূজার দুই দিন আগে কটিয়াদী- মঠখোলা সড়কের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে যাত্রাঘাট নামক স্থানে এসে জমায়েত হন। তারপর রাজা নিজে সবার বাজনা শুনে বেছে নেন সেরা দলটিকে। সেই থেকেই প্রচলন এই ঢাকের হাটের। পরে এ হাট স্থানান্তর হয় পুরাতন বাজারের মাছমহাল এলাকায়। কটিয়াদী পূজা উদযাপন পরিষদ ফ্রন্টের আহ্বায়ক দিলীপ সাহা জানান, দুর্গাপূজা শুরুর আগের ৩ থেকে ৫ দিন এ হাট বসে। সোমবার বিকেলে শুরু হওয়া ঢাকের হাট শেষ হবে শনিবার।
কটিয়াদীর ঢাকের হাট শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনেরও প্রতীক। ঢাকের আওয়াজ বাঙালির প্রাণে জাগায় উচ্ছ্বাস। গ্রামীণ সমাজে ঢাক বাজলে মানুষ বুঝে যেত আনন্দ-উৎসবের ডাক এসেছে। আজও দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা যেন বেজে ওঠে এই হাটের ঢাকের শব্দে।
তবে আধুনিকতার চাপ ও যান্ত্রিক বাদ্যযন্ত্রের কারণে ঢাকের চাহিদা কিছুটা কমেছে। ঢাক তৈরির কাঁচামাল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, কারিগরও কমে গেছে। তবু এই হাট টিকে আছে সংস্কৃতিপ্রেমীদের ভালোবাসায় ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তায়। স্থানীয় প্রশাসন ও সংস্কৃতি সংগঠনগুলোও ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে আসছে।
আজকের প্রজন্মের কাছে এই ঢাকের হাট কেবল বাজার নয়, বরং ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। পাঁচ শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা এ আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—লোকসংস্কৃতির শক্তিই জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ঢাকের হাট তাই শুধু একটি হাট নয়, এটি বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির এক মহামূল্যবান সম্পদ।
খবরওয়ালা/এমএজেড