মো. মাহমুদ হাসান
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫
সরকারের উপর নাকি ঠাডা পড়েছে!!
কথাটি আমার নয়, সিলেট অঞ্চলের এক ভুক্তভোগীর। সিলেট বিভাগের অধিকাংশ মানুষও নাকি তাই বিশ্বাস করেন!! ভীষণ বিপদের কথা। ‘ঠাডা’ শব্দটি ভয়ানক বিপজ্জনক। যাঁর উপরে পড়ে, বাঁচার উপায় নেই।
বর্ষাকালে আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। কখনো বা ভয়ানক বিপজ্জনক শব্দে জনপদ কেঁপে ওঠে। প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যুতায়িত হয়ে মানুষের প্রাণহানিও ঘটে। বজ্রপাতে এমন মৃত্যুর অসংখ্য উদাহরণ আছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এহেন ঘটনাকে সিলেট অঞ্চলের মানুষ ‘ঠাডা’ বলে। এখন ঝড় তুফানের সময় নয়, আকাশে ও মেঘ নেই!! তাহলে সরকারের উপর ‘ঠাডা’ পড়লো কেন?
বিচ্ছিন্নভাবে এখানে সেখানে ঠাডা পড়ে এক দু’জন মানুষের মৃত্যুর কথা শুনেছি। সরকারের উপর ঠাডা পড়লে, দেশটা তো অচল হয়ে যাওয়ার কথা! কেন সিলেটবাসী মনে করেন, সরকারের উপর ঠাডা পড়েছে? গণমাধ্যমে শুনলাম সাবেক মেয়র আরিফ সাহেব বলেছেন, ‘বেশি উলটাপালটা করবেন না, ডেডলক করে দেবো’!!
দশকের পর দশক যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক আলোর মুখ দেখে না। আজ উদ্বোধন, কাল বন্ধ। একনেকের পাশ করা প্রকল্প! চট্টগ্রামের দিকে ছুটলে, অর্থাভাব নেই। অর্থনীতিতে অবদান কতটুকু বিবেচিত না হলেও, বরিশালের খাল বিলে পাকা সড়কের অভাব নেই। দাবি উঠুক আর নাইবা উঠুক, ঝাঁকি ছাড়া রংপুর-দিনাজপুর যাওয়াও সহজ। আর ঢাকা থেকে সিলেট, জীবন নাকি যায় যায়!! সড়কপথ-রেলপথ, উভয় দিকে সংকট! মেয়র আরিফের ভাষায়, বিমানে নাকি তেলেসমাতি কাজ কারবার!! যার থেকে যা পারে, দশ, বিশ, ত্রিশ -কোন বালাই নেই!!
ফসলের মাঠে শত শত অবৈধ ড্রেজার! কৃষকের জমির নীচ ফুটো করে লাখ লাখ ঘনফুট বালি পাচার হয় নষ্ট মহাজনদের কাছে। অবৈধ দলিলপত্র বানিয়ে কৃষকের জমি বেহাত হয়ে, তথাকথিত শিল্প কারখানা গড়ে উঠে। পরিকল্পিত বর্জ্য নিষ্কাশনের কোন ব্যবস্থাপনা নেই। যে যেভাবে পারছে সেদিকেই ছাড়ছে। নদী-নালা,খাল-বিলে আর মিষ্টি পানি নেই। মাছের আবাসে দুর্গন্ধযুক্ত দূষিত কালো বর্জ্য।
অল্প বৃষ্টিতে ডুবে যায় সিলেট শহর। খোয়াই এর ভাঙনে হবিগঞ্জে প্লাবন, এটি তো নৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে। হাওর উন্নয়নের নামে প্রতিবার হাজার কোটি বরাদ্দের গল্প শোনা যায়। নদী শাসনের বালাই নেই, নদীর বরাদ্দ যায় কোথায়। সিলেট বিভাগের উল্লেখযোগ্য ভূমি বনজ সম্পদে ভরপুর। গ্যাস, বিদ্যুৎ, চা-শিল্প আর বনজ সম্পদের রাজস্ব কোন জনতা পায়?
অপরিকল্পিত শিল্পায়নে জনজীবন অতিষ্ঠ। বায়ু দূষণের প্রভাবে অনেক অঞ্চল মহামারিতে আক্রান্ত। চারিদিকে পরিবেশ প্রতিবেশের মহামারী। জনজীবন রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর নামে একটি বিভাগ আছে। সিলেটে বোধ হয়, সেটিও মরে গেছে! চৈনক্যবাদী সরকারের আগে পরিবেশবাদীদের কিছু প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ছিল। সিলেটবাসীদের কি দুর্ভাগ্য!! বেলার নির্বাহী পরিবেশের প্রধান হলে, প্রকৃতিবাদীরা ও যেন নীরব হয়ে গেল! সিভিল প্রশাসন!! রাজনীতির লীলাখেলা সামাল দিতেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। পরিবেশের উটকো ঝামেলা নেয়ার সময় কোথায়?
পাহাড় অঞ্চলের ঢালুতে, ক্ষমতাবান শিল্পপতিরা শিল্প গ্রাম গড়ে তুলেছেন। ছড়া,খাল সব ভরাট হয়ে গেছে। অল্প বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় কৃষকের ফসল। এ গরীব কৃষকদের দেখার কেউ নেই। সৎ জনপ্রতিনিধিরা ক্ষমতার সঙ্গে কুলোতে পারে না। অসৎ আর লোভীরা মিশে যায় ক্ষমতার বলয়ে। আমজনতার ভাগ্যে, আহাজারি যেন একমাত্র অবলম্বন। সামাজিক দায়বদ্ধতা, এ যেন দুঃস্বপ্নের আঁধার!! এমন পরিস্থিতিতে, ‘সরকারের উপর ঠাডা পড়েছে’ এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর কি হতে পারে?
লেখক: কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক
খবরওয়ালা/এমএজেড