এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: রবিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৫
“ঐ মালতিলতা দোলে, দোলে পিয়াল তরুর কোলে…” এই সুরে ভেসে ওঠে এক মায়াবী কণ্ঠ— কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইতিহাসে যার নাম উচ্চারিত হয় এক অনির্বাণ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।
১৯২৪ সালের ১২ অক্টোবর, পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার সোনামুখিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা সত্যচরণ মুখোপাধ্যায়, বিশ্বভারতী গ্রন্থাগারের কর্মী; মাতা অনিলা দেবী, শান্তিনিকেতনের আশ্রমজননী। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। তাঁর বোনেরা— সুরেখা, সুহিতা, ঝর্না, বীথিকা; ভাইরা— শান্তময়, সুমন ও পান্নালাল।
তাঁর পৈতৃক নাম ছিল অণিমা মুখোপাধ্যায়, ডাকনাম মোহর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন “কণিকা”— এ নামই তাঁকে অমর করে রাখে বাংলার সংগীত ইতিহাসে।
শৈশবে তিনি শুনে শুনেই গান শেখেন, যেন সংগীত ছিল তাঁর স্বভাবের শ্বাসপ্রশ্বাস। পরে শান্তিনিকেতনে এসে ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের কাছে নিয়মিত গান শেখার সুযোগ পান। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নতুন গান শেখানোর জন্য প্রায়ই ডেকে পাঠাতেন এই প্রতিভাবান কিশোরীকে।
১৯৩৫ সালে, শিশুশিল্পী হিসেবে শান্তিনিকেতনের শারদোৎসবে প্রথম মঞ্চে গান করেন।
১৯৩৭ সালে, কলকাতার ছায়া সিনেমা হলে আয়োজিত বর্ষামঙ্গল উৎসবে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে পরিবেশন করেন “ছায়া ঘনাইছে বনে বনে”— এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত!
একই বছরে, হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি তাঁর গাওয়া দুটি গানের রেকর্ড প্রকাশ করে (নং H-584):
“ওরে ওই বন্ধ হল দ্বার” ও “ও গান নিয়ে মোর খেলা”— এই গানগুলোই তাঁকে নিয়ে আসে জনমানসে।
১৯৩৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড (নং H-1021) —“ঐ মালতিলতা দোলে” ও “ঘরেতে ভ্রমর এলো”— যা আজও রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে অনুরণিত হয়।
১৯৪০ সালে, বোলপুর টেলিফোন কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি গেয়েছিলেন “ওগো তুমি পঞ্চদশী”,যা বেতারে সম্প্রচারিত হয়েছিল— এটি ছিল তাঁর প্রথম বেতার অনুষ্ঠান।
১৯৪১ সালে, রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ অনুসারে তাঁর মৃত্যুপরবর্তী অনুষ্ঠানে ‘সমুখে শান্তি পারাবার’ দলগতভাবে পরিবেশিত হয়, সেই দলে ছিলেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়— এক অনন্য সাক্ষ্য তাঁর শিল্পীজীবনের সূচনাপর্বের।
১৯৪৩ সালে, মাত্র ৪০ টাকা বেতনে তিনি শান্তিনিকেতনের সঙ্গীতভবনে শিক্ষকতা শুরু করেন—এবং হয়ে ওঠেন বিশ্বভারতীর অন্যতম শ্রদ্ধেয় সংগীতগুরু।
চলচ্চিত্রেও তাঁর কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়েছে— তথাপি, নিমন্ত্রণ, বিগলিত করুণা, জাহ্নবী যমুনা ও আহবান চলচ্চিত্রে তিনি গান গেয়েছেন স্নিগ্ধ আবেগে।
২০০০ সালের ৫ এপ্রিল, বাংলা সংগীতের এই কালজয়ী সাধিকা পরপারে পাড়ি জমান। তবু তাঁর কণ্ঠে গাওয়া প্রতিটি রবীন্দ্রসঙ্গীত আজও আমাদের অন্তরে বেজে ওঠে— যেন শান্তিনিকেতনের সেই অলিন্দে আবারও দোলে মালতিলতা, মৃদু হাওয়ায় ভেসে আসে তাঁর কণ্ঠস্বর।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনন্য সাধিকা – কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা