অনিশ্চয়তায় ডুবছে পুঁজিবাজার

দেশের পুঁজিবাজার গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী। ঢাকার প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসই ও চট্টগ্রামের সিএসই—দু’টি বাজারেই লেনদেন শুরুর মুহূর্ত থেকেই সূচক নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে। টানা দরপতনের জেরে গত সপ্তাহে উভয় বাজারের সম্মিলিত বাজারমূলধন কমেছে ২৬ হাজার ৫১৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা, নীতিগত অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এই কাঠামোগত পতনের মূল কারণ।

ক্ষমতার পরিবর্তন পরবর্তী উত্থান—তারপর আবার ধস

গত বছরের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় ছিলেন। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পরদিন ৬ আগস্ট ডিএসইএক্স সূচক প্রায় ২০০ পয়েন্ট বা ৩.৭৭% বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী চার কার্যদিবসে সূচক আরও ৮০০ পয়েন্ট বেড়ে ৬ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করে—যা ছিল বাজারে স্বল্পস্থায়ী এক চাঙ্গাভাবের প্রতিচ্ছবি।

তবে এই ইতিবাচক গতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই সূচক ও লেনদেন দুই–ই কমতে থাকে। মে মাসের শেষ দিকে ডিএসইতে দৈনিক লেনদেন কমে ২৫০ কোটি টাকায় নেমে আসে এবং ডিএসইএক্স সূচক ১,২০০ পয়েন্ট পড়ে ৪,৭৮৫ পয়েন্টে গিয়ে দাঁড়ায়। মাঝে–মধ্যে সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বাজার আর স্থায়ী পুনরুদ্ধার দেখেনি; বরং অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে।

নীতিগত অসঙ্গতি ও একীভূতকরণকে ঘিরে আতঙ্ক

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নমুখিতার প্রধান কারণ তিনটি—

জাতীয় নির্বাচন সময়মতো হবে কি না—এ নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

নতুন মার্জিন ঋণ বিধিমালা—যা বিনিয়োগকারীদের জন্য জটিল ও সীমাবদ্ধতামূলক

একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের শূন্য দাম ঘোষণা ও লেনদেন স্থগিত

৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ঘোষণা দেন যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এসআইবিএল, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের ইক্যুইটি শূন্যের নিচে নেমে গেছে। ফলে শেয়ারগুলোর মূল্য ‘জিরো’ বিবেচনা করা হবে। বাজারে এই ঘোষণা বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। পরদিন বিএসইসি পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন স্থগিত করে। ক্ষুব্ধ ছোট বিনিয়োগকারীরা ঢাকার মতিঝিলে ডিএসই ভবনের সামনে মানববন্ধন করেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

যদিও অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, গভর্নরের ঘোষণা চূড়ান্ত নয় এবং বিষয়টি সরকার পুনর্বিবেচনা করবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নেট সেলিং: আস্থার সংকেত

অক্টোবর মাসে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের চেয়ে শেয়ার বিক্রি করেছেন বেশি। তালিকাভুক্ত ৩৬০ কোম্পানির মধ্যে ৩৪টি কোম্পানিতে বিদেশি শেয়ার কমেছে—যার আর্থিক মূল্য অন্তত ১৬৯ কোটি টাকা। বিপরীতে মাত্র ১৩ কোম্পানিতে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। একই মাসে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ১১ হাজার ১৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৩৩০টির বেশি কোম্পানির দর কমেছে।

রোববারের বাজার: স্বল্প উত্থানেও সামগ্রিক ছবি নেতিবাচক

সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইএক্স সূচক ২৯.৪৬ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,৭৩২ পয়েন্টে। লেনদেন হয়েছে ২৯৮ কোটি টাকা, যা আগের দিনের ৩৮৩ কোটির তুলনায় কম। ২৩৬ কোম্পানির দর বাড়লেও ১১৩ কোম্পানির দর আরও কমেছে।
অন্যদিকে সিএসইতে টানা ১১ কার্যদিবসের মতোই সূচক পতন অব্যাহত—সিএএসপিআই ৭৪ পয়েন্ট কমেছে।

বাজারজুড়ে আস্থাহীনতা ও ধাক্কাধাক্কি–প্রবণতা

ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম মনে করেন, পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া বাজারে ভয় ছড়িয়েছে। বিশেষত, আরও কিছু দুর্বল ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানি অবসায়ন অথবা একীভূত হওয়ার গুঞ্জন বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য করছে। এতে সূচক আরও পড়ে যাচ্ছে এবং বাজারের অস্থিরতা স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।