খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
‘তুই বড় ব্যবসায়ী, পাঁচ কোটি টাকা দিবি। না দিলে তোকে আর তোর পরিবারকে মেরে ফেলব।’ রাজধানীর পল্লবীর এক ব্যবসায়ীকে এমন ভয়াবহ হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা। নির্ধারিত টাকা না পেয়ে তারা ওই ব্যবসায়ীর পায়ে গুলি চালায়।
এর পর থেকে তিনি পরিবারসহ তীব্র আতঙ্কে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। শুধু এই ব্যবসায়ীই নন—গত বছরের ৫ আগস্টের পর রাজধানীসহ সারা দেশেই নীরব চাঁদাবাজির এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে।
গণমাধ্যমকে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক এক পরিচালক বলেন, তাঁর কারখানা চট্টগ্রাম ইপিজেডে অবস্থিত। রাজনৈতিক পরিবেশ পরিবর্তনের পর তাঁর কাছেও বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। দুই যুগ ধরে ব্যবসা পরিচালনা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার পরও তিনি চাঁদার দাবির মুখে পড়েছেন। দাবি না মানায় তাঁকে ভয়ভীতি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আট মাস ধরে মানহানির শিকার হতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামের এক পরিচিত নারী উদ্যোক্তা জানান, নগরের শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ তাঁর কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছে এবং চাঁদা না দেওয়ায় বহুবার হত্যার হুমকি দিয়েছে। এতে তিনি ও তাঁর পরিবার চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
রবিবার ও সোমবার কারওয়ানবাজার, গুলিস্তান, নিউমার্কেট, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, তেজগাঁও, উত্তরা, মতিঝিলসহ রাজধানীর নানা এলাকায় সরেজমিনে জানা গেছে—ফুটপাতে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি চলছে। ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ১০০ থেকে ৫০০ টাকা করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। হকার্স মালিক সমিতির এক নেতা জানান, প্রতিদিন ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করছে চাঁদাবাজ চক্র।
চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে ফুটপাতের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও অতিষ্ঠ। বাড়িঘর নির্মাণের সময়ও চাঁদা দিতে হয়। অধিকাংশ চাঁদাবাজের রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে; কেউ পুরনো দলের, কেউ নতুন উদীয়মান দলের; আবার অনেকে বড় নেতাদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করছে। ধীরে ধীরে এটি সারা দেশে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন—কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও দলীয় পরিচয়ধারী নেতা এ কাজে জড়িত। যদিও মাঝে মাঝে পুলিশ কিছু চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করছে, তবুও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থামছে না। রাজনৈতিক দলগুলো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিলেও অপরাধীরা দাপট কমাচ্ছে না।
পুলিশের আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের ধরতে পুলিশ সারা দেশে সক্রিয় রয়েছে এবং বহু সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতা কঠিন হলেও চাঁদাবাজির ‘সমঝোতা’ খুব সহজ—এক দল পতনের পর অন্য দল দ্রুত জায়গা দখল করে নেয়। তাঁর বক্তব্য ইঙ্গিত করে, চাঁদাবাজি এখন রাজনৈতিক অর্থনীতির টেকসই অংশে পরিণত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে সারা দেশে দুই হাজার ৩২৫টির বেশি চাঁদাবাজির ঘটনার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়েছে; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকা অনুযায়ী রাজধানীতে আড়াই হাজারের বেশি চিহ্নিত চাঁদাবাজ রয়েছে। দেশজুড়ে প্রতিটি জেলা ও থানায়ও হালনাগাদ তালিকা প্রস্তুত হয়েছে—প্রতি জেলায় এক হাজারের বেশি চাঁদাবাজ চিহ্নিত।
গণমাধ্যমের হাতে থাকা ডিএমপির মিরপুরের পল্লবী থানার তালিকায় ৬৬ জন এবং মোহাম্মদপুর থানার তালিকায় ১২৫ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজের নাম রয়েছে। ডিএমপির প্রতিটি থানায় ৫০ থেকে ১০০ জনের হালনাগাদ তালিকা আছে।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, চাঁদাবাজি একটি সামাজিক সমস্যা। এ কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে। চাঁদাবাজদের তালিকা করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দশ মাসে এক হাজারের বেশি চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১৫ জুলাই থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত আট বিভাগে ৬৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়; এদের মধ্যে ৩৭১ জন নতুন চাঁদাবাজ। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে। গত ছয় মাসে ডিএমপিতে ৪১৯টি মামলা হয়েছে এবং শতাধিক অপরাধী ধরা পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে; আর সেই সুযোগে নতুন চাঁদাবাজ চক্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
পুলিশ জানায়, আওয়ামী লীগের পতনের পর পুরনো চক্র দুর্বল হয়ে ‘শূন্যস্থান’ তৈরি হওয়ায় নতুন গোষ্ঠীরা সক্রিয় হয় এবং অনেক আগের অপরাধীরাও নজরদারির বাইরে থেকে আবার কাজে নেমে আসে।
চাঁদাবাজির বড় ক্ষেত্র—ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন, বাজার, আবাসন ও শ্রমিক সংগঠন। রাজনৈতিক পরিচয় ও স্থানীয় দাপট কাজে লাগিয়ে চাঁদাবাজরা আধিপত্য বিস্তার করছে। গ্যাং সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের আড়ালে থাকা নেতারাও এতে যুক্ত।
গত ১৪ মাসে চাঁদা না পেয়ে শতাধিক মানুষ খুন হয়েছে; এর মধ্যে রাজধানীতে ২০ জন। মগবাজার, মতিঝিল, বাড্ডা, গুলশানসহ এলাকাগুলোতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেশি। বাড্ডার গুদারাঘাটে বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধনকে গুলি করে হত্যা, হাতিরঝিলে যুবদল সদস্য আরিফ সিকদারের হত্যাকাণ্ড—সবই চাঁদাবাজি–সম্পর্কিত দ্বন্দ্ব থেকে ঘটেছে।
পল্লবীর এক ব্যবসায়ী লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন—জামিলুর নামের একজন তাকে হুমকি দিচ্ছে। কারওয়ানবাজারের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, তিনি মসলার ব্যবসায়ী; গত ৫ আগস্টের পর বহু টাকা দিয়েছেন, এখন আরও লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে, ফলে তিনি লুকিয়ে আছেন।
ট্রাকচালকরাও জানান, পথে পথে কয়েক ধাপে চাঁদা দিতে হয়। সারা দেশে দুই শতাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে গণমাধ্যম জানতে পেরেছে—চাঁদাবাজি নীরবে সর্বত্র চলছে।
গোয়েন্দারা পাঁচটি গোষ্ঠীকে চাঁদাবাজির মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন—রাজনৈতিক ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ, প্রশাসনের অভ্যন্তরের স্বার্থান্ধ মহল, স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনী এবং কিছু পেশাজীবী সংগঠনের আড়ালে থাকা নেতাদের চক্র।
ঢাকার পরিবহন খাতে প্রতিদিন ৫৩টি টার্মিনাল ও স্ট্যান্ডে সোয়া দুই কোটি টাকার মতো চাঁদা ওঠে। মাস শেষে তা হয় ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা। সারা দেশে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি অবৈধ টাকা ওঠে।
চালকদের অভিযোগ—চাঁদা না দিলে গাড়ি আটকে রাখা, রুট বন্ধ করা বা হামলার মুখে পড়তে হয়। শ্রমিক সংগঠনের নামে গড়ে ওঠা চক্র ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা–কর্মীরাই এতে সক্রিয়।
দেশের প্রায় সব হাট–বাজারে খোলামেলা চাঁদাবাজি চলছে। দোকানপ্রতি প্রতিদিন ৫০ থেকে কয়েক শ টাকা দিতে হয়; না দিলে পরিবহন বন্ধ, ব্যবসা সংকুচিত করা বা হামলার মতো পরিস্থিতি হয়।
৬ অক্টোবর প্রয়াত বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্রবধূ তানজিন হামিদ মিতুল চাঁদাবাজির অভিযোগে হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন। ওসি মো. রাজু জানান, তদন্ত চলছে।
২০ অক্টোবর বারিধারায় মানববন্ধন করে বারভিডা—তাদের অভিযোগ, আগস্ট থেকে অজানা নম্বর থেকে চাঁদা দাবি, হোয়াটসঅ্যাপে একে–৪৭ রাইফেলের ছবি পাঠিয়ে ভয় দেখানো এবং গাড়ি বিক্রয়কেন্দ্রে ককটেল হামলা চলছে। ১২টি শোরুমে বিস্ফোরণ ঘটেছে তবুও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি বলে জানান বারভিডা সভাপতি আবদুল হক।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এ জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, র্যাব সারা দেশে চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের ধরতে তৎপর রয়েছে।
খবরওয়ালা/টিএসএন