খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে চেতনানাশক খাইয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেল করার ঘটনায় গ্রেপ্তার তিন শিক্ষার্থীর রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ঘটনাটি শুধু অপরাধ নয়—বরং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন সহিংসতার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব এবং আইন–প্রয়োগকারীদের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আজ তদন্ত কর্মকর্তা সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক তাজুল ইসলাম সোহাগ তাজুল ইসলাম ও শ্রাবণ সাহার তিন দিন এবং অন্তু দেওয়ানের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আরেক আসামি দেলোয়ার ভূঁইয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এই রিমান্ড মঞ্জুরি থেকে বুঝা যাচ্ছে—তদন্তকারীরা চেতনানাশক সংগ্রহ, ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য, পূর্বপরিকল্পনা এবং ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো সংগঠিত নেটওয়ার্ক জড়িত কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান।
এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ৭ এপ্রিল সহপাঠীদের আহ্বানে পিকনিকে যাওয়ার পথে বাদীকে কোমল পানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক মেশানো হয়। জ্ঞান ফিরলে তিনি নিজেকে অপরিচিত পরিবেশে এবং ধর্ষিত অবস্থায় দেখতে পান। পরবর্তীতে জানতে পারেন—ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করা হয়েছে।
এই ভিডিওকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তাকে চাপে রাখা হয়। ভয় দেখানো হয়—বিষয়টি প্রকাশ বা অভিযোগ করলে ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
আরও উদ্বেগজনক হলো—প্রথম ঘটনার কয়েক মাস পর আবারও তাকে একই দলের সদস্যরা আটকায়। ৬ নভেম্বর সকালে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে তাকে মারধর এবং নেশাজাতীয় পানীয় খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। অভিযোগে উল্লেখ আছে—অন্তু দেওয়ানের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করার পরিকল্পনা ছিল।
ধর্ষণের পর ভুক্তভোগীকে দ্বিতীয়বার হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হতে দেখা সাম্প্রতিক যৌন সহিংসতার জটিল সামাজিক মানসিকতা ফুটিয়ে তোলে।
বিশ্লেষকরা বলছেন—এই ঘটনার তিনটি দিক বিশেষভাবে উদ্বেগজনক:
১. সহপাঠীরাই মূল অভিযুক্ত—বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব ও আস্থার কাঠামো ভঙ্গুর
২. চেতনানাশক ব্যবহার—এটি ‘ডেট রেপ’ ধাঁচের ঘটনার প্রসার বাড়ছে
৩. ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেল—ডিজিটাল যন্ত্রকে অপরাধের অস্ত্রে রূপান্তর
বাংলাদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি নিষিদ্ধ নীতিমালা থাকলেও তা পর্যাপ্তভাবে বাস্তবায়িত হয় না। অভিযোগ ব্যবস্থায় তদন্ত স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এ ধরনের ঘটনার সাথে যুক্ত গভীর সামাজিক সমস্যা রয়েছে—
মেয়েদের সম্মতি অবজ্ঞা করার মানসিকতা
যৌন সম্পর্ককে ‘শক্তির প্রকাশ’ হিসেবে দেখা
নারীর ওপর চাপ প্রয়োগে ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহার
ক্যাম্পাস রাজনীতি ও ছাত্রগোষ্ঠীর প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এগুলো কেবল আইন দিয়ে থামানো কঠিন; প্রয়োজন বড় মাত্রার সচেতনতা, মূল্যবোধ শিক্ষা, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা।
এই মামলায় রয়েছে—
ধর্ষণ
যৌথ অপরাধ
চেতনানাশক প্রয়োগ
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী ব্ল্যাকমেল
শারীরিক আঘাত এবং অপহরণের চেষ্টা
এই সমস্ত ধারায় দণ্ড সর্বোচ্চ আজীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এই ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রশ্ন আবারও সামনে এনেছে। তদন্ত প্রক্রিয়া সামনে এগোলে পরিষ্কার হবে—এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি আরও গভীর নেটওয়ার্কের অংশ। তবে স্পষ্ট যে, যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, সমাজ ও আইনি কাঠামোর সমন্বয় ছাড়া এমন অপরাধ থামানো কঠিন।