খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অনেক নাম উজ্জ্বলভাবে আবির্ভূত হয়েছে, যারা ত্যাগ, সাহস ও নিবেদিত চেতনার মাধ্যমে জাতির লাল-সবুজ পতাকায় চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছেন। সেই পথপ্রদর্শকদের মধ্যে একজন সাহসী সাংবাদিক ও শহীদ, নিজাম উদ্দিন আহমদ।
নিজাম উদ্দিন ১৯২৯ সালে মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার মাওয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সিরাজুল ইসলাম ছিলেন একজন পরিশ্রমী নৌপরিবহন নিরীক্ষক, আর মাতা ফাতেমা বেগম ছিলেন পরিবারের নৈতিকতা ও মানবিকতার প্রেরণা। পরিবারের এ মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলা নিজাম উদ্দিনের চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে, যা পরবর্তীতে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়, সত্য এবং দেশপ্রেমের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। দুর্ভাগ্যবশত, তার পরিবারের জন্য ব্যক্তিগত ট্রাজেডিও ছিল—তার কন্যা শারমিন ১৯৮৮ সালের শারমিন রীমা হত্যা কাণ্ডের শিকার হন, যা আজও দেশের সমাজচেতনায় একটি কুখ্যাত অধ্যায় হিসেবে অমলিন।
শিক্ষাজীবন শুরু হয় বিক্রমপুর ভাগ্যকুল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। সেখান থেকে সাফল্যের সঙ্গে স্নাতক হয়ে তিনি হরগঙ্গা সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকেই নিজাম উদ্দিন প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৫ সালে তিনি ফিল্ড মার্শাল আযুব খানের “বেসিক ডেমোক্রেসি” নির্বাচনে স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন, যা তার জনমুখী নেতৃত্বের প্রমাণ।
নিজাম উদ্দিন সাহসের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনগুলোতে—১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের সংযুক্ত ফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান। এই সাহসী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে সাংবাদিকতার পথে পরিচালিত করে, যেখানে তিনি সত্য ও জাতির চেতনা প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
সাংবাদিকতা শুরু করেন ১৯৫০ সালে করাচির সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গেজেটে। পরবর্তীতে তিনি অবদান রাখেন দৈনিক মিল্লাত, আজাদ, ঢাকা টাইমস ও পাকিস্তান অবজার্ভারে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মধ্যেও তার সংবাদ প্রচারের কাজ ছিল গুরুত্বপূর্ণ—এদের মধ্যে APP, UPI, PPI, রয়টার্স, AFP ও BBC উল্লেখযোগ্য।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজাম উদ্দিন বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে গণহত্যা ও মুক্তির সঠিক তথ্য পৌঁছে দিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জন্য সমর্থন গড়ে তোলেন।
তবে এই সত্যনিষ্ঠ প্রতিশ্রুতিই তার প্রাণ কেড়ে নেয়। ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাক সেনা ও আল-বদর বাহিনী তাঁকে রোকনপুর, পুরান ঢাকার কাছে অপহরণ করে। সেই দিন দেশের একজন সাহসী ও সৎ মানুষকে হারায়। তার কবর আজও অজানা।
তবুও, নিজাম উদ্দিন আহমদের ত্যাগ, সততা ও অবদান আজও বাংলাদেশের জাতির হৃদয়ে উজ্জীবিত। আমরা স্মরণ করি এই নিঃসন্দেহে সাহসী, অমর সাংবাদিক শহীদকে, যিনি চিরকাল সত্য এবং দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে থাকবেন।