খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি ২০২৬
উত্তরের কৃষিনির্ভর চার জেলা—রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে—নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহারের ফলে মারাত্মক পরিবেশগত ও কৃষি সংকট তৈরি হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব জেলায় বর্তমানে অন্তত ৫৯৫টি ইটভাটা ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে সরাসরি ফসলি জমির টপ সয়েল ব্যবহার করছে। এর ফলে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হয়ে ফসল উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়ছে।
কৃষিবিদদের মতে, টপ সয়েল বা জমির উপরিভাগের মাটিই কৃষিজমির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এই স্তরে জৈব পদার্থ, পুষ্টি উপাদান ও অণুজীবের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে, যা ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য। একবার এই মাটি তুলে নেওয়া হলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জমির উর্বরতা ফিরে আসতে ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
| জেলা | ইটভাটার সংখ্যা |
|---|---|
| রংপুর | উল্লেখযোগ্য অংশ |
| গাইবান্ধা | বহু ইটভাটা |
| কুড়িগ্রাম | ব্যাপক |
| লালমনিরহাট | উচ্চসংখ্যক |
| মোট | ৫৯৫ |
আইন অমান্য করে কৃষিজমির মাটি ব্যবহারের অভিযোগে গত এক সপ্তাহে এসব জেলায় ১২টি ইটভাটাকে মোট ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম, ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, উলিপুর, সুন্দরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলায় একযোগে অভিযান পরিচালিত হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান চললেও কার্যত মাটি সরবরাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না।
ইটভাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা জানান, একটি ইট তৈরিতে গড়ে প্রায় পাঁচ কেজি মাটি প্রয়োজন হয় এবং বছরে একটি ইটভাটায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ইট উৎপাদন করা হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির মাটি সংগ্রহ করা ছাড়া মালিকদের বিকল্প থাকে না। ইটভাটার মালিকদের দাবি, কৃষকরা স্বেচ্ছায় ভালো দামের আশায় মাটি বিক্রি করেন। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার কৃষক আফতাব উদ্দিন জানান, একাধিক জমির মাটি একসঙ্গে কেটে নেওয়ার ফলে আশপাশের জমি নিচু হয়ে যায়, সেচ ও চাষাবাদে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এতে বাধ্য হয়েই অন্য কৃষকরাও মাটি বিক্রি করতে রাজি হন। পীরগাছার কৃষক নারায়ণ সরকার বলেন, এক বিঘা জমির টপ সয়েল ১৮–২০ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও পরবর্তী কয়েক বছর ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এভাবে টপ সয়েল ধ্বংস হলে শুধু কৃষি নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাফিনুর রহমান জানান, টপ সয়েল অপসারণ মাটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে দেয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
রংপুর বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, কৃষিজমি রক্ষায় জেলা প্রশাসকদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে টেকসই সমাধানের জন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে উৎসাহ ও কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।