খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
“আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর
থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর–”
এই দুই লাইনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গ্রামবাংলার মাটি, মানুষের আন্তরিকতা আর এক সহজ-সরল মানবিক দর্শন। এই চিরসবুজ পঙ্ক্তির স্রষ্টা—কবি বন্দে আলী মিয়া, যিনি আমাদের কাছে ভালোবেসে পরিচিত “গল্প দাদু” নামে।
বাংলা সাহিত্যের এক বহুমাত্রিক প্রতিভা বন্দে আলী মিয়া ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও চিত্রকর। বিশেষত পল্লীজীবন ও শিশুমনের জগৎকে তিনি যে মমতা ও নান্দনিকতায় ধারণ করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৭ জানুয়ারি ১৯০৬ সালে, পাবনা জেলার রাধানগর গ্রামে, এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। তাঁর পিতা মুন্সি উমেদ আলী ছিলেন পাবনা জজকোর্টের একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারী। সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেও শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগই বন্দে আলী মিয়াকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন কৃতিত্ববান। পাবনার মজুমদার একাডেমি থেকে ১৯২৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর ভর্তি হন কলকাতা আর্ট একাডেমিতে, যেখানে তিনি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতার এই ভিত্তিই তাঁর সাহিত্যজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
সাংবাদিকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। ১৯২৫ সালে ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৩০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা তাঁর জীবনকে করে তোলে আরও সমৃদ্ধ।
দেশবিভাগের পূর্ববর্তী কলকাতা জীবনে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্য লাভ করেন—যা তাঁর সাহিত্যচেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও পরিশীলিত করে। এই সময়েই তাঁর সৃজনশীলতার স্বর্ণযুগ সূচিত হয়। তখন পর্যন্ত তাঁর প্রায় ২০০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে তাঁর রচিত পালাগান ও নাটিকা রেকর্ড আকারে প্রকাশিত হয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
১৯৬৪ সালের পর তিনি ঢাকায় এসে প্রথমে ঢাকা বেতার এবং পরে রাজশাহী বেতারে কর্মরত থাকেন। বেতারের মাধ্যমে তাঁর লেখা ও কণ্ঠ আরও বিস্তৃত শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়।
বন্দে আলী মিয়ার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পল্লী প্রকৃতি ও গ্রামবাংলার রূপ-রসের নিখুঁত চিত্রায়ণ। প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের সরল জীবনবোধ, শিশুদের কল্পনার জগৎ—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অসাধারণ দক্ষ। তাঁর রচিত শিশুতোষ সাহিত্য আজও কালজয়ী ও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সাহিত্যাঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি
১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার,
১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার,
১৯৭৮ সালে রাজশাহীর ‘উত্তরা সাহিত্য মজলিস’ পদক লাভ করেন।
পরবর্তীতে তিনি মরণোত্তর একুশে পদক-এ ভূষিত হন—যা তাঁর সাহিত্যিক মর্যাদার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।
১৯৭৯ সালের ২৭ জুন, রাজশাহী মহানগরীর কাজির হাটে নিজ বাসভবনে এই মহান কথাশিল্পী ও কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বন্দে আলী মিয়া আমাদের সাহিত্যে কেবল একজন কবি নন—তিনি গ্রামবাংলার মুখ, শিশুমনের বন্ধু, আর এক মানবিক সৌন্দর্যের নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।
গল্প দাদু, আপনাকে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।