খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
রাজধানী ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় বর্তমানে অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। দ্রুতগতি এবং সহজলভ্যতার কারণে এটি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হলেও বিশৃঙ্খল চলাচল ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইনোভিশন’ পরিচালিত ‘আরবান মবিলিটি স্টাডি: রিকশা ইন ট্রানজিশন’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর ৫৬.৬০ শতাংশ যাত্রী এই বাহনটিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত দিয়েছেন। আজ রোববার কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
ইনোভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সরোয়ার গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করতে গিয়ে জানান, রাজধানীর ৩৮৪ জন রিকশাচালক, ৩৯২ জন যাত্রী এবং ৬৩টি গ্যারেজ মালিকের মতামতের ভিত্তিতে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, যাত্রীদের একটি বড় অংশ (২১.৯০ শতাংশ) এই বাহনটি পুরোপুরি বন্ধ করার পক্ষে। তবে ৩৩.৯৩ শতাংশ যাত্রী মনে করেন, মূল সড়কে না হলেও শুধুমাত্র গলির ভেতরে চলাচলের জন্য এটি কার্যকর হতে পারে। অধিকাংশ যাত্রী (৮২ শতাংশ) দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো এবং তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে বেছে নিলেও ৩০ শতাংশ যাত্রী এই বাহনটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন।
গবেষণায় রাজধানীর রিকশা চলাচলের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। দেখা গেছে, সড়কে চলাচলকারী প্রায় সব ব্যাটারিচালিত রিকশাই অবৈধ। ব্যাটারিচালিত রিকশার ৯৭.৪ শতাংশেরই কোনো সরকারি নিবন্ধন নেই। এমনকি প্যাডেলচালিত রিকশার ক্ষেত্রেও প্রায় ৮৬ শতাংশের কোনো লাইসেন্স নেই। নিবন্ধনের এই অভাবের কারণে শহরজুড়ে রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে।
গবেষণায় প্রাপ্ত রিকশার ধরণ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণের তুলনামূলক চিত্র:
| সূচক ও মাপকাঠি | ব্যাটারিচালিত রিকশা | প্যাডেলচালিত রিকশা |
| নিবন্ধনহীন রিকশার হার | ৯৭.৪% | ৮৫.৯৪% |
| দুর্ঘটনার ঝুঁকি (যাত্রী মতামতে) | ৩০% | ১৮% |
| যানজটের জন্য দায়ী (জনমত) | ৬২% | ৩৪% |
| চালক রিকশার মালিক নন | ৭৯% | ৬৫% |
| চালকের গড় ঋণের পরিমাণ | ৭৯,৯২৭ টাকা | ১৮,৬৫৪ টাকা |
গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ব্যাটারিচালিত রিকশা চালকদের ৭৫ শতাংশেরই আগে রিকশা চালানোর কোনো পেশাদার অভিজ্ঞতা নেই। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক তরুণ এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। ভয়েস ফর রিফর্মের সংগঠক ফাহিম মাসরুর জানান, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সাময়িক বেকারত্ব কাটাতে বিপুল সংখ্যক মানুষ এই খাতে প্রবেশ করেছে। তবে এই চালকদের অর্থনৈতিক অবস্থাও বেশ নাজুক; তাদের গড় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার টাকা, যা তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট অফিসার মো. সেলিম খান সভায় জানান, রাজধানীতে প্রায় ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চললেও তাদের কোনো নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা নেই। ফলে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থেকে এগুলো যানজট সৃষ্টি করে। তবে তিনি ফুটপাত ও সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাকেও যানজটের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সুসংগঠিত পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বুয়েটের অধ্যাপক মো. মুসলেহ উদ্দিন হাসান গণপরিবহন বা পাবলিক বাস পরিষেবাকে আরও উন্নত করার পরামর্শ দেন, যাতে মানুষ রিকশার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে পারে। সভায় বক্তারা চালকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সচল করা এবং নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়ার আহ্বান জানান। সরকার, রিকশা মালিক-শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে রাজধানী ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে।