খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করল সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলা প্রশাসন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ উপলক্ষ্যে সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী সকল প্রার্থী একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ করেছেন এবং নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার শপথ নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি, ২০২৬) বেলা ১১টায় উল্লাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এই ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষে গৃহীত এই উদ্যোগ স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার এ.টি.এম আরিফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের মূল শিরোনাম ছিল ‘এক মঞ্চে সব প্রার্থীর উপস্থিতিতে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ ও আচরণবিধি প্রতিপালনের ঘোষণা’। অনুষ্ঠানে প্রার্থীরা কেবল তাঁদের উন্নয়নের রূপরেখাই তুলে ধরেননি, বরং নির্বাচন পরবর্তী সময়েও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। প্রশাসনের এই সাহসী পদক্ষেপের ফলে নির্বাচনী সহিংসতা রোধ এবং সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রে আসার পথে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক অভয় তৈরি হয়েছে।
এক নজরে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলসমূহ:
| প্রার্থীর নাম | রাজনৈতিক দল ও প্রতীক | প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার |
| এম আকবর আলী | বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) | সুশাসন, গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার ও অবকাঠামো উন্নয়ন। |
| মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান | বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী | নৈতিক সমাজ গঠন, দারিদ্র্য বিমোচন ও শিক্ষা সংস্কার। |
| মুফতি আব্দুর রহমান | ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ | ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ইসলামি মূল্যবোধের উন্নয়ন। |
| মো. হিলটন প্রামাণিক | জাতীয় পার্টি | আধুনিক উল্লাপাড়া গঠন ও পল্লী অঞ্চলের কর্মসংস্থান। |
| মো. আব্দুল হাকিম | বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি | শ্রমিক-কৃষকের অধিকার রক্ষা ও সমতাভিত্তিক সমাজ। |
অনুষ্ঠানে উপস্থিত পাঁচজন প্রার্থীই নিজ নিজ বক্তৃতায় উল্লাপাড়ার সার্বিক উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থান খাতের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তবে সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয়টি ছিল নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার দৃঢ় ঘোষণা। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবরের মাঝে এই প্রার্থীরা সম্মিলিতভাবে ঘোষণা করেছেন যে, নির্বাচন হবে একটি উৎসব, কোনো সংঘাতের ক্ষেত্র নয়। তাঁরা কর্মীবাহিনীকে শান্তি বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতি দেন।
অনুষ্ঠানটি সফল করতে উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন আক্তার রিমা, উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়াসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন এবং উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম এই সম্প্রীতির মঞ্চে উপস্থিত হয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্তটির সাক্ষী হন। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েকশ নেতাকর্মী এই অভূতপূর্ব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন।
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের এই সম্প্রীতির মঞ্চ মূলত আধুনিক গণতন্ত্রের এক পরিশীলিত রূপ। ভোটাররা মনে করছেন, যখন প্রার্থীরা নিজেরা একই মঞ্চে হাসিমুখে কথা বলেন, তখন মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে হানাহানি করার সুযোগ কমে যায়। প্রশাসনের এই ‘উল্লাপাড়া মডেল’ যদি দেশের বাকি ৩০০ আসনেই অনুসরণ করা হতো, তবে নির্বাচন নিয়ে মানুষের আতঙ্ক অনেকাংশেই দূর হতো। শান্তিপূর্ণ সমাজ ও স্থিতিশীল অর্থনীতির স্বার্থে এই রাজনৈতিক সহাবস্থান কেবল নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য নয়, বরং স্থায়ী ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি।