খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে যাত্রীসেবা দ্রুততর করার লক্ষ্যে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত ‘ই-গেট’ বা স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখন শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়েছে। সাড়ে ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এই ৪৪টি ই-গেট যাত্রীদের বিড়ম্বনা কমানোর পরিবর্তে হয়রানি ও সময়ক্ষেপণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে কারিগরি ত্রুটি ও প্রশাসনিক সমন্বহীনতার কারণে অধিকাংশ ই-গেটই বন্ধ রাখা হয়েছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে এক বড় ধরনের অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
২০১৮ সালে ‘বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন’ প্রকল্পের অধীনে এই ই-গেট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা পরবর্তী সময়ে বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৯ হাজার ৩৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যে কেবল ৪৪টি ই-গেট স্থাপনের জন্য ব্যয় করা হয়েছে ৩৪ কোটি ৫৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। জার্মান সংস্থা ভেরিডোস জিএমবিএইচ এই গেটগুলো স্থাপনের দায়িত্ব পালন করে।
এক নজরে দেশে স্থাপিত ই-গেটসমূহের বিন্যাস:
| বন্দরের নাম | ই-গেটের সংখ্যা | বর্তমান অবস্থা |
| হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা | ২৬টি | বহির্গমনে বন্ধ, আগমনে আংশিক সচল |
| শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম | ০৬টি | অধিকাংশ সময় অকেজো |
| ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট | ০৬টি | কারিগরি সমস্যায় জর্জরিত |
| বেনাপোল স্থলবন্দর | ০৪টি | সচল (সূত্র: ইমিগ্রেশন পুলিশ) |
| বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর | ০২টি | অনিয়মিত ব্যবহার |
| মোট | ৪৪টি | সার্বিকভাবে অকার্যকর |
ই-গেট স্থাপনের সময় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, মাত্র ১৮ সেকেন্ডের মধ্যে একজন ই-পাসপোর্টধারী যাত্রী তাঁর ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ই-গেট দিয়ে কেবল পাসপোর্ট ও যাত্রীর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও, ভিসার সত্যতা যাচাই বা যাত্রী কোন ফ্লাইটে যাচ্ছেন—সেই তথ্য সংরক্ষণের কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এই গেটগুলোতে নেই। ফলে ই-গেট অতিক্রম করার পরও যাত্রীকে পুনরায় ইমিগ্রেশন পুলিশের ডেস্কে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এতে করে যাত্রীদের আগের তুলনায় দ্বিগুণ সময় নষ্ট হচ্ছে।
ইমিগ্রেশন পুলিশের (এসবি) সদস্যদের মতে, বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী যাত্রীদের প্রায় ৪০ শতাংশই বর্তমানে ই-পাসপোর্ট ব্যবহারকারী। কিন্তু ই-গেট সফটওয়্যারের সাথে ইমিগ্রেশন ডেটাবেজের সঠিক সমন্বয় না থাকায় ডেটা আদান-প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় ই-গেটে তথ্য ইনপুট দিলেও তা মূল সার্ভারে পৌঁছায় না। এ কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় অনেক স্থানেই এই সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ (নির্বাহী পরিচালক, শাহজালাল বিমানবন্দর) জানান, ভিসার তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় গেটগুলো বন্ধ রয়েছে, তবে পুনরায় সচল করার চেষ্টা চলছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম এই পরিস্থিতিকে জনগণের অর্থের অপচয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর বা অন্যান্য উন্নত দেশে এই প্রযুক্তি জনবল ছাড়াই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করছে, অথচ বাংলাদেশে কেন এটি অকার্যকর তা খতিয়ে দেখা জরুরি। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এই মূল্যবান যন্ত্রপাতিগুলো স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে যাতায়াতকারী যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, ডিজিটাল সেবার নামে তাঁদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অপমানজনক।
ই-পাসপোর্ট ও ই-গেট প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি গৌরবময় মাইলফলক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে ৩৪ কোটি টাকার সম্পদ আজ অব্যবহৃত পড়ে আছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে কারিগরি ত্রুটি দূর করে ই-গেটের সাথে ভিসা যাচাই ব্যবস্থার সমন্বয় করা। অন্যথায় এই বিশাল বিনিয়োগ কেবল জনগণের ট্যাক্সের টাকার শ্রাদ্ধ হিসেবেই গণ্য হবে।