খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 12শে মাঘ ১৪৩২ | ২৫ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
গুয়ামের জঙ্গলে ২৮ বছর একাকী যুদ্ধজীবন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রকাণ্ড উত্তাপে প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়াম দ্বীপপুঞ্জে মুখোমুখি হয় জাপানি ও মার্কিন সেনারা। জুলাই ১৯৪৪ সালে মার্কিন বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে জাপানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সেই সময়ে গুয়ামের গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে পড়েন জাপানের রাজকীয় সেনাবাহিনীর ল্যান্স করপোরাল শোইচি ইয়োকোই।
শোইচি মূলত যুদ্ধবন্দী হওয়ার ভয়ে জঙ্গলে একাকী জীবন যাপন করতে থাকেন। প্রথমে তাঁর সঙ্গীও ছিলেন, তবে ক্রমেই ক্ষুধা, রোগ ও ভয়াবহ বন্যার কারণে সবাই হারিয়ে যান। ১৯৬৪ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর শোইচি একাকী হয়ে যান। এরপর তিনি প্রায় ৮ বছর একাকী গুয়ামের জঙ্গলে কাটান, যেখানে তাঁর খাদ্য ছিল ব্যাঙ, নদীর ইল ও ইঁদুর, যাদের মধ্যে কিছু বিষাক্তও ছিল।
২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্থানীয় শিকারিরা তাঁকে অবশেষে উদ্ধার করেন। সেই সময় শোইচির বয়স ছিল ৫৭ বছর। ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় ২৮ বছর আগে শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শোইচি বাইরের বিশ্বের সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তাঁর ভাইপো অমি হাতাশিন বলেন, “শোইচি উদ্ধারকালে ভীষণ আতঙ্কিত ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, তাঁকে ধরে নিয়ে যাবেন এবং এটি তাঁর ও পরিবারের জন্য লজ্জার বিষয় হবে।”
উদ্ধারের পর শোইচিকে জাপানে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ‘যুদ্ধের নায়ক’ হিসেবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তবে আধুনিক জাপানের ব্যস্ত ও দ্রুত পরিবর্তিত জীবনে তিনি কখনো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেননি। হাতাশিন জানান, শোইচি নতুন ব্যাংকনোট দেখে বলেছিলেন, “এটা এখন মূল্যহীন।”
শোইচির জীবন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর ভাইপো ১৯৭৪ সালে একটি জাপানি বই প্রকাশ করেন। পরে ২০০৯ সালে তা ইংরেজিতে বের হয়, নামকরণ করা হয় ‘Private Yokoi’s War and Life on Guam, 1944–1972’।
শোইচি ইয়োকোইর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও যুদ্ধকালীন তথ্য:
| তথ্য | বিবরণ |
|---|---|
| জন্ম | ৩১ মার্চ ১৯১৫, শাওরি, আইচি প্রদেশ, জাপান |
| সামরিক যোগদান | ১৯৪১, জাপানের রাজকীয় সেনাবাহিনী |
| গুয়ামে অবস্থান | ১৯৪৪–১৯৭২ |
| একাকীত্ব | ১৯৬৪–১৯৭২ (৮ বছর) |
| উদ্ধার | ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২, গুয়াম |
| মৃত্যু | ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭, নাগোয়া, জাপান |
গুয়ামের জঙ্গলে শোইচি যে দীর্ঘসময় একা কাটিয়েছেন, তা যুদ্ধকালীন মানবসংবেদনার এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। তাঁর জীবন কেবল যুদ্ধের স্মৃতি নয়, বরং এক অদম্য মানসিকতা ও জীবনসংগ্রামের নিদর্শন হিসেবেও চিহ্নিত। গুয়ামের জাদুঘরে তাঁর তৈরি ইল ধরার ফাঁদ, ছবিসহ অন্যান্য নিদর্শন এখনও সংরক্ষিত আছে, যা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের এক গভীর শিক্ষা দেয়।