কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় এক গৃহবধূকে পেট্রল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগে তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত ফাতেমা আক্তার (৩০) দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ঢাকার একটি হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনার পর নিহতের পরিবার এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় সোমবার (২০ এপ্রিল) রাতে নিহতের ছোট বোন কুলসুমা আক্তার বাদী হয়ে চৌদ্দগ্রাম থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় স্বামী জলিল আহমেদ জাবেদ (৩৫) কে একমাত্র আসামি করা হয়। পরে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার জাবেদ পেশায় একজন মাইক্রোবাস চালক।
ঘটনার পটভূমি ও অভিযোগ
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় ১১ বছর আগে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুনবতী ইউনিয়নের চাঁপাচৌ গ্রামের অলি আহমেদের ছেলে জলিল আহমেদ জাবেদের সঙ্গে ফাতেমা আক্তারের বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি আট বছর বয়সী কন্যাসন্তান রয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের ঘটনা চলছিল। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আবারও তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় জাবেদ ক্ষিপ্ত হয়ে ঘরে মজুত করা পেট্রল ফাতেমার শরীরে ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন।
পরিবারের দাবি, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত পক্ষ ঘটনাটিকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বলে প্রচার করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।
চিকিৎসা ও মৃত্যু
গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় ফাতেমা আক্তারকে প্রথমে ফেনী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে প্রায় ছয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯ এপ্রিল তিনি মারা যান।
ঘটনার সময়রেখা
| তারিখ |
ঘটনা |
| ১৩ এপ্রিল |
পারিবারিক কলহ, আগুনে দগ্ধ হওয়ার অভিযোগ |
| ১৩ এপ্রিল (পরবর্তীতে) |
ফেনী সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর |
| ১৯ এপ্রিল |
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু |
| ২০ এপ্রিল |
হত্যা মামলা দায়ের |
| ২১ এপ্রিল |
অভিযুক্ত স্বামী গ্রেপ্তার |
পুলিশের বক্তব্য
চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আরিফ হোছাইন জানান, নিহতের বোন কুলসুমা আক্তারের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা গ্রহণের পরপরই অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুরে অভিযুক্তকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে দম্পতির মধ্যে কলহ চললেও এমন ভয়াবহ ঘটনার কথা তারা কল্পনাও করতে পারেননি। অনেকে বিষয়টিকে নারীর প্রতি সহিংসতার একটি চরম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতা ও দাম্পত্য নির্যাতনের ঘটনা অনেক সময় অপ্রকাশিত থেকে যায়, যার ফলে পরিণতি ভয়াবহ রূপ নেয়। তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
সার্বিক পরিস্থিতি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ফরেনসিক ও প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে নিহতের পরিবার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
এই ঘটনা আবারও পারিবারিক সহিংসতা, নারীর নিরাপত্তা এবং বিচার প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।