খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু হাজ্জাজের বিরুদ্ধে জেনারেটরের ডিজেল চুরি থেকে শুরু করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই ‘অদৃশ্য’ লুটপাটের ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল এবং হাসপাতালের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাঁরা অনতিবিলম্বে অভিযুক্ত তত্ত্বাবধায়ককে সরিয়ে একটি নিরপেক্ষ বিশেষ অডিট (Special Audit) পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।
হাসপাতালের বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নীলফামারীতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের মাত্রা খুব একটা না থাকলেও জেনারেটর ব্যবহারের নামে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ডিজেল ক্রয়ের ভুয়া বিল তৈরি করা হয়েছে। বাস্তবে জেনারেটর চালানো না হলেও নিয়মিতভাবে তেলের বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, তথ্যপ্রযুক্তি (IT) এবং পরিবহন খাতের কথা বলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা লোপাট করা হচ্ছে। কাগজে-কলমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খাতে বিপুল ব্যয় দেখানো হলেও হাসপাতালের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর।
নীলফামারী সরকারি হাসপাতালের দুর্নীতির প্রধান ক্ষেত্রসমূহ:
| অনিয়মের খাত | দুর্নীতির ধরণ ও অভিযোগের বিবরণ |
| জেনারেটর ডিজেল | বিদ্যুৎ বিভ্রাট না থাকলেও ৩০ লাখ টাকার তেলের ভুয়া বিল। |
| ঠিকাদার কমিশন | বিল পাশের বিনিময়ে অডিটের নামে ৫ শতাংশ নগদ আদায়। |
| পরিবহন ও জ্বালানি | অ্যাম্বুলেন্সে ব্যক্তিগত মালামাল পরিবহন ও তেলের অতিরিক্ত খরচ। |
| এমএসআর ও আইটি | ভুয়া ভাউচার ও নিম্নমানের মালামাল ক্রয়ের মাধ্যমে অর্থ লোপাট। |
| আউটসোর্সিং নিয়োগ | নিয়োগ বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অযোগ্যদের কর্মসংস্থান। |
| এমএসএস খাত | পছন্দের লোককে কাজ দিয়ে বিছানার চাদরসহ সরঞ্জাম কেনায় অনিয়ম। |
হাসপাতালের এমএসআর (মেডিকেল স্টোরস রুলস) খাতের কেনাকাটার ক্ষেত্রেও দুর্নীতির জাল বিস্তৃত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, তাঁদের বিল পাশ করানোর জন্য অডিটের নাম করে মোট মূল্যের ৫ শতাংশ টাকা অগ্রিম তত্ত্বাবধায়ককে দিতে হয়। এই অনৈতিক সুবিধা না দিলে ঠিকাদারদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স রোগীদের সেবার বদলে রংপুর থেকে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। এতে জ্বালানি তেলের অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। এছাড়া আউটসোর্সিং নিয়োগ এবং হাসপাতালের বিছানার চাদর ও লিনেন সামগ্রী ধোয়ার কাজে ডা. আবু হাজ্জাজ তাঁর পছন্দের লোকদের সুযোগ দিয়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা দাবি করেছেন।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের মতে, গত চার বছর ধরে ডা. আবু হাজ্জাজ কার্যত কোনো জবাবদিহি ছাড়াই হাসপাতালটি পরিচালনা করছেন। তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে একে হাসপাতালের চেয়ে ‘লুটপাটের আখড়া’ হিসেবেই বেশি দেখছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে সখ্যতা থাকায় একাধিক অভিযোগের পরও তিনি একই কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু হাজ্জাজের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্থানীয় সচেতন মহল এবং বৈষম্যবিরোধী নাগরিক সমাজের দাবি, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ককে স্বপদে বহাল রেখে তদন্ত করলে তা স্বচ্ছ হবে না। তাই একটি উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে হাসপাতালের বিগত চার বছরের কর্মকাণ্ডের বিশেষ অডিট করা হলে অন্তত ২০ কোটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণ মিলবে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।