খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্রমবর্ধমান উত্তজনা ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষিতে রাশিয়া তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন ‘রোসাটম’-এর প্রধান আলেক্সি লিখাচেভ জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় যেকোনো জরুরি মুহূর্তে কেন্দ্রটি থেকে রুশ কর্মীদের সরিয়ে নিতে মস্কো সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার হুমকির মুখে এই সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
রোসাটম প্রধান লিখাচেভ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান যে, তাঁরা বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমরা রুশ পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় রক্ষা করছি। আমাদের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং নির্দেশ পাওয়ামাত্রই তাঁদের সরিয়ে নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রাশিয়ার কারিগরি সহযোগিতায় নির্মিত এবং এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বর্তমানে শত শত রুশ প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত রয়েছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সম্প্রতি সেখানে অবস্থানরত রুশ নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
আলেক্সি লিখাচেভ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন যে, বুশেহর পারমাণবিক স্থাপনায় যেকোনো ধরনের সামরিক হামলা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল মহাবিপর্যয়ের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান ইউক্রেন) চেরনোবিল বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত। বুশেহর কেন্দ্রে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার তেজস্ক্রিয়তা কেবল ইরান নয়, বরং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল জনপদে দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে।
পারমাণবিক স্থাপনাটির গুরুত্ব ও ঝুঁকির তুলনামূলক তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
সারণি: বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্র ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
| সূচক | তথ্য ও বিবরণ |
| স্থাপনার অবস্থান | বুশেহর, ইরান (পারস্য উপসাগরীয় উপকূল) |
| সহযোগিতাকারী দেশ | রাশিয়া (রোসাটম) |
| বর্তমান ঝুঁকি | সামরিক হামলার সম্ভাবনা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা |
| চেরনোবিল বিপর্যয়ের সাল | ২৬ এপ্রিল, ১৯৮৬ |
| বিপর্যয়ের ধরণ | তেজস্ক্রিয় পদার্থের অনিয়ন্ত্রিত নিঃসরণ |
| সম্ভাব্য ফলাফল | পরিবেশগত বিপর্যয়, দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি ও গণ-উদ্বাস্তু সমস্যা |
যদিও গত জুন মাসে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় পশ্চিমা হামলার খবর পাওয়া গিয়েছিল, তবে বুশেহর কেন্দ্রটি সেই আক্রমণ থেকে মুক্ত ছিল। মূলত এই কেন্দ্রটি বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ব্যবহৃত হলেও এর চারপাশের কঠোর নিরাপত্তা বলয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে এটি সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। রোসাটম দাবি করেছে যে, বুশেহরের চুল্লিগুলো আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্বারা সুরক্ষিত, তবে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের মুখে কোনো স্থাপনাই পুরোপুরি অভেদ্য নয়।
রাশিয়া কেবল কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাই করছে না, বরং তারা কূটনৈতিকভাবে ইরান ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে কথা বলছে যাতে এই স্পর্শকাতর এলাকাটিকে সংঘাতের বাইরে রাখা যায়। পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা কোনো সীমানা মানে না, তাই বুশেহরের নিরাপত্তা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পরমাণু শক্তি বিশেষজ্ঞদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।