খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
আফ্রিকার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলে নিজের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য সুসংহত করার লক্ষ্যে সোমালিয়াতে অত্যাধুনিক এফ-১৬ (F-16) যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে তুরস্ক। বৃহস্পতিবার তুর্কি ও সোমালি সরকারি কর্মকর্তারা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আঙ্কারার এই পদক্ষেপটি কেবল সোমালিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নয়, বরং লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিমানগুলো সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশু সংলগ্ন তুর্কি সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থান করবে। উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালে মোগাদিশুতে তুরস্ক তাদের বৃহত্তম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি ‘তুর্কসোম’ (TURKSOM) উদ্বোধন করেছিল। নতুন মোতায়েন করা এই জেটগুলো সোমালি বাহিনীর পরিবর্তে তুর্কি কন্টিনজেন্টের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন তুর্কি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “এটি মূলত আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা এবং সোমালিয়ায় নিয়োজিত তুর্কি কর্মীদের সুরক্ষার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে।” এর মাধ্যমে তুরস্ক স্পষ্ট করে দিল যে, যুদ্ধবিমানগুলো ব্যবহারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আঙ্কারার হাতেই থাকছে।
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| মোতায়েনকৃত যুদ্ধবিমান | এফ-১৬ (F-16) মাল্টি-রোল ফাইটার জেট |
| মোতায়েনের স্থান | মোগাদিশু, সোমালিয়া (তুর্কসোম ঘাঁটি) |
| মূল লক্ষ্য | সন্ত্রাসবাদ দমন ও তুর্কি স্বার্থ রক্ষা |
| পরিচালনা কর্তৃপক্ষ | তুর্কি এয়ার কম্পোনেন্ট কমান্ড |
| সহযোগিতার সূচনা | ১৯৯০-এর দশকের প্রথম ভাগ থেকে |
| প্রধান ঘাঁটি | তুর্কসোম (তুরস্কের বৃহত্তম বিদেশি ঘাঁটি) |
তুরস্কের এই সামরিক পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে এল যখন এই অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সোমালিল্যান্ডের স্বঘোষিত স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছে আঙ্কারা। তুরস্ক একে ‘সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ’ এবং সোমালিয়ার অখণ্ডতার বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
১৯৯১ সালে সিয়াদ বারে সরকারের পতনের পর থেকে সোমালিল্যান্ড স্বায়ত্তশাসিতভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। যদিও সোমালিল্যান্ড তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, কিন্তু সোমালিয়া মূল ভূখণ্ডে আল-শাবাবের মতো কট্টরপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপদ্রব অব্যাহত রয়েছে। তুরস্কের এই এফ-১৬ মোতায়েন আল-শাবাবের বিরুদ্ধে সোমালি বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্ভাব্য যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সোমালিয়ার পুনর্গঠনে তুরস্ক সব সময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। কেবল সামরিক প্রশিক্ষণই নয়, বরং মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নেও তুরস্ক কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। মোগাদিশুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং প্রধান সমুদ্রবন্দর বর্তমানে তুর্কি কোম্পানিগুলো পরিচালনা করছে।
তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, সেখানে একটি টাস্কফোর্স বজায় রাখার মূল লক্ষ্য হলো সোমালি সেনাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং পরামর্শমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশটিকে স্বাবলম্বী করে তোলা। এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি এই প্রচেষ্টাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল, যা ভবিষ্যতে লোহিত সাগরের নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তুরস্কের এই শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি ইথিওপিয়া, মিশর এবং ইসরায়েলের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্য একটি পরিষ্কার সংকেত যে, সোমালিয়ার নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আঙ্কারা যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত।