খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রতিক অচলাবস্থা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করেছেন যে, সরবরাহ ব্যবস্থা বা লজিস্টিকস খাত বিঘ্নিত হওয়া মানেই হলো জাতীয় অর্থনীতির ওপর সরাসরি নেতিবাচক আঘাত। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনায় তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বর্তমানে শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মবিরতি পালন করছেন। এর ফলে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। মাসরুর রিয়াজের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির কলেবর যে হারে বাড়ছে, সেই তুলনায় বন্দরের সক্ষমতা এখনো অনেক পিছিয়ে। তিনি গুরুত্বারোপ করেন যে, বে টার্মিনাল বা মাতারবাড়ীর মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে যদি আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর ও বিদেশি বিনিয়োগ (পিপিপি পদ্ধতিতে) যুক্ত না করা যায়, তবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।
লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার একটি পরিষ্কার চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের নাম | প্রভাব ও লক্ষ্যমাত্রা |
| লজিস্টিকস ব্যয় হ্রাস | ১% ব্যয় কমলে রপ্তানি বৃদ্ধি পায় প্রায় ৭% |
| জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা | ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার |
| বিদ্যমান সংকট | বন্দরে শ্রমিক ধর্মঘট ও পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা |
| প্রস্তাবিত সমাধান | এনএলপি ২০২৫-এর অধীনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লজিস্টিকস বিভাগ গঠন |
| ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা | বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ |
আলোচনা সভায় অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোমেশন এবং ডিকার্বনাইজেশন বর্তমানে বৈশ্বিক লজিস্টিকস খাতকে আমূল বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, সিএফ গ্লোবালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আনাম তুলে ধরেন আকাশপথের লজিস্টিকস ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা। তাঁর মতে, ঢাকার বিমানবন্দরে লজিস্টিকস ব্যয় সড়কপথের চেয়েও ২০-২৫ শতাংশ বেশি, যা ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট না থাকা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ পরিবহন বিশেষজ্ঞ নুসরাত নাহিদ ববি এবং সিটিব্যাংক এনএ-এর কান্ট্রি অফিসার মো. মইনুল হক লজিস্টিকস খাতে দ্রুত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘জাতীয় লজিস্টিকস নীতি’ দ্রুত অনুমোদন এবং ‘শুল্ক আইন ২০২৩’-এর যথাযথ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল পেমেন্ট এবং ইলেকট্রনিক নথি দাখিলের মাধ্যমে লজিস্টিকস প্রক্রিয়াকে সহজতর করা গেলে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারবে।
পরিশেষে বলা যায়, বন্দর কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এই হৃৎপিণ্ডের সচলতা বজায় রাখতে হলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন করে আধুনিক ব্যবস্থাপনায় যেতে হবে। অন্যথায় লজিস্টিকস খাতের এই দুর্বলতা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।