খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। বিগত তিনটি বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের পর এবারের ভোট কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক মহাপরীক্ষা। এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ব হলো—জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই একই দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে গণভোট। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনটি মৌলিকভাবে আলাদা, যেখানে প্রথাগত দলীয় আনুগত্যের চেয়ে ব্যক্তিগত বিচার-বুদ্ধি এবং আগামীর স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটার সম্ভাবনা বেশি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শাসক দল আওয়ামী লীগের পতনের পর ভোটের সব পুরোনো হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অনুপস্থিত থাকলেও তাদের তৃণমূলের বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের অবস্থান এবারের নির্বাচনে একটি বড় রহস্য। যদিও দলটির পক্ষ থেকে ভোট বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে, তবুও অনেক আসনে এই ‘নীরব ভোটাররা’ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণে ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করবেন। হামলা-মামলায় জর্জরিত এই ভোটাররা প্রকাশ্যে সক্রিয় না হলেও গোপণ ব্যালটে তাঁদের সিদ্ধান্তের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
| ভোটার গোষ্ঠী | মোট ভোটার (আনুমানিক) | নির্বাচনে প্রভাব ও ভূমিকা |
| মোট ভোটার | ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন | দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নির্ধারণ। |
| নারী ভোটার | ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন | অর্ধেক শক্তি; অধিকাংশ নারীই দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে ভোট দেন। |
| তরুণ (১৮-৩৫ বছর) | প্রায় ৫ কোটি | প্রধান ‘কিংমেকার’; প্রার্থীর ক্লিন ইমেজ ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রাধান্য দেন। |
| সংখ্যালঘু ভোটার | ১ কোটিরও বেশি | কিছু আসনে ৪০% পর্যন্ত প্রভাব; প্রার্থীর অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁদের মূল বিবেচ্য। |
| আওয়ামী ভোটার | অনির্ধারিত | বর্তমানে নীরব; তাঁদের ভোট কোন বাক্সে পড়বে তা জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক। |
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা এখন প্রায় পাঁচ কোটি। এই বিশাল তরুণ জনশক্তিই আগামীর ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রধান ‘কিংমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ভোটারদের একটি বড় অংশই প্রচলিত দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে বিশ্বাসী নয়। তারা প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে এলাকার উন্নয়ন, ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা বা ক্লিন ইমেজ এবং প্রার্থীর জনসম্পৃক্ততাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের মতে, এই তরুণরা যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে পড়বেন, সেই প্রার্থীর বিজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাবে।
নারীরা বরাবরই বাংলাদেশের নির্বাচনে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে থাকেন। তৃণমূলের নারীরা সরাসরি রাজনীতিতে না জড়ালেও ভোটকেন্দ্রে তাঁদের উপস্থিতি পুরুষদের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি থাকে। ফলে সব রাজনৈতিক দলই তাঁদের ইশতেহারে নারীদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একইভাবে, দেশের প্রায় এক কোটির বেশি সংখ্যালঘু ভোটার কিছু কিছু আসনে ৪০ শতাংশের বেশি প্রভাব রাখেন। তাঁরা মূলত নিরাপত্তা ও অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেন এমন প্রার্থীকেই বেছে নেবেন।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. আব্দুল আলীমের মতে, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ফলে ভোটের ব্যবধান হবে অত্যন্ত কম। এই সংকীর্ণ ব্যবধানে জয়ী হতে হলে তরুণ ও নীরব ভোটারদের মন জয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনও দোদুল্যমান; তারা প্রকাশ্য কোনো মিছিলে নেই, নেই কোনো শ্লোগানে—কিন্তু ১৬ ফেব্রুয়ারি তারা যখন ভোটকক্ষের গোপন বুথে সিলের মাধ্যমে রায় দেবেন, তখনই নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশের প্রকৃত পথ।