ট্রাম্পের কঠোর পাঁচ শর্ত: ইরান কি যুদ্ধের পথে?

ওমানের মাসকাটে যখন পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, তখন ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশিতে জমায়েত হচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীর বিশাল এক রণতরী বহর। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সাফল্যের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে ইরানকে বেছে নিয়েছেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের প্রতি ট্রাম্পের দেওয়া নতুন পাঁচটি শর্ত এতটাই চরমপন্থী ও অনমনীয় যে, সেগুলো মেনে নেওয়া কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে।

ট্রাম্পের ‘অসম্ভব’ পাঁচ শর্তের ব্যবচ্ছেদ

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘মাআরিভ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন তেহরানের সামনে যে দাবিগুলো রেখেছে, তা অনেকটা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শামিল। ট্রাম্প প্রশাসন কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং ইরানের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে সমূলে উৎপাটন করতে চায়।

ট্রাম্পের দাবিকৃত প্রধান পাঁচটি শর্ত ও সেগুলোর প্রভাব নিচে তুলে ধরা হলো:

শর্তের ক্রম মূল দাবিসমূহ সম্ভাব্য প্রভাব ও ইরানের অবস্থান
৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর ইরানের পারমাণবিক জ্বালানির মজুত শূন্য করা।
সকল পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণা ও অবকাঠামো ধূলিসাৎ করা।
ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা বাতিল ইরানের একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিলোপ।
আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা।
নিঃশর্ত আন্তর্জাতিক তদারকি সামরিক ঘাঁটিতে যেকোনো সময় মার্কিন ও আইএইএ প্রবেশাধিকার।

তেহরানের পালটা চ্যালেঞ্জ ও রণকৌশল

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, “ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এখন অত্যন্ত চিন্তিত হওয়া উচিত।” ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে ভেনেজুয়েলায় মাদুরো সরকারকে নতি স্বীকারে বাধ্য করার অভিজ্ঞতা। তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ইরানকে ভেনেজুয়েলার সাথে তুলনা করা হবে একটি বড় কৌশলগত ভুল। তেহরান গত ৪৫ বছর ধরে ঠিক এই ধরনের পরিস্থিতির জন্যই নিজেদের প্রস্তুত করেছে।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আবদুলরহিম মুসাভি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তারা তাদের সামরিক নীতিকে ‘রক্ষণাত্মক’ থেকে ‘আক্রমণাত্মক’ অবস্থানে পরিবর্তন করেছেন। গত জুন মাসের হামলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইরান এখন ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (Asymmetric Warfare) নীতি গ্রহণ করেছে, যেখানে ড্রোন ও ক্ষুদ্র নৌবহরের মাধ্যমে মার্কিন বিশাল রণতরীগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা হবে।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া

চ্যাথাম হাউসের পরিচালক ব্রনওয়েন ম্যাডক্সের মতে, ব্যালিস্টিক মিসাইল হলো ইরানের একমাত্র ঢাল। এই কর্মসূচি বন্ধ করার অর্থ হলো ইসরায়েলি বিমান শক্তি এবং মার্কিন স্টিলথ বোমারু বিমানের সামনে নিজেদের সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে দেওয়া। কোনো ইরানি সরকারই এই আত্মঘাতী শর্ত মেনে নেবে না।

এদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর মন্ত্রিসভা এই আলোচনার ফলাফল নিয়ে ঘোরতর সংশয় প্রকাশ করেছেন। জ্বালানি মন্ত্রী ইলি কোহেন সরাসরি দাবি করেছেন যে, ইরানের সাথে কোনো চুক্তির মূল্য নেই, বরং সামরিক পদক্ষেপই একমাত্র সমাধান। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ প্রধান শেখ নাঈম কাসেম ঘোষণা করেছেন যে, এই সংঘাত শুরু হলে তাঁরা নিরপেক্ষ থাকবেন না; বরং এটি হবে পুরো অঞ্চলের ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’।

সংঘাতের শেষ পরিণতি কী?

হোয়াইট হাউসের বর্তমান অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই আলোচনা সফল হওয়ার ব্যাপারে তারা নিজেরাই সন্দিহান। কেবল আঞ্চলিক মিত্রদের অনুরোধ রক্ষার্থেই তারা মাসকাট প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপের মুখে, তখন ইরানের মতো পুরনো শত্রুর ওপর আক্রমণ তাঁর জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের একটি পথ হতে পারে। তবে এই ‘অসম্ভব’ দাবিগুলো মূলত প্রত্যাখ্যান করার জন্যই সাজানো হয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত হামলা শুরু হয়, তবে ইরানও পালটা আঘাত হানবে, যা সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে এক অপূরণীয় ধস নামাতে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।