যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম টানা চতুর্থ দিনের মতো বেড়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে দুই দেশের পরস্পরবিরোধী অবস্থান বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দরে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২৬ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ৯১ দশমিক ২৮ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৩৭ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ৩১ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবারও তেলের বাজারে উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। ২৪ জুলাইয়ের পর মঙ্গলবার জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। বুধবারের লেনদেনেও সেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকায় বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে এই পথের গুরুত্ব অনেক। ফলে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে পার্থক্য বাজারের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা এখন মূলত দুই দেশের কূটনৈতিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছেন। সংঘাতের মাত্রা বাড়লে জ্বালানি সরবরাহে বাস্তব কোনো বাধা তৈরি হবে কি না, সেটিই বাজারের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সরবরাহে ঝুঁকি বাড়লে দামে আরও চাপ
তেলের বাজারে দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান সরবরাহ নয়, ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও বড় ভূমিকা রাখে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন অঞ্চল বা পরিবহনপথ নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হলে ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কায় আগেভাগেই তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন। বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই ধরনের ঝুঁকি বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে।
অন্যদিকে শান্তি আলোচনা এগিয়ে গেলে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকার বিষয়ে নিশ্চয়তা তৈরি হলে তেলের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ কিছুটা কমতে পারে। তাই আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক অগ্রগতি ও নৌপথের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে।
এ কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের ধারাবাহিকতা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হলে আগামী দিনগুলোতে অপরিশোধিত তেলের দামে আরও ওঠানামা দেখা দিতে পারে।

