সুরের ভুবনে ইজরায়েলি আঘাত: এক শৈল্পিক ট্র্যাজেডি

তেহরানের আকাশ যখন বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে, তখন কেবল ইট-পাথরের দালানই ধসে পড়ে না, সেই সাথে ধুলোয় মিশে যায় তিলে তিলে গড়া হাজারো মানুষের স্বপ্ন। গত ২৩ মার্চ তেহরানের পূর্বাঞ্চলে ইজরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বিখ্যাত ‘হোনিয়াক মিউজিক একাডেমি’। যেখানে এক সময় সেতার, সন্তুর আর আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধনে সুরের মায়াজাল তৈরি হতো, সেখানে এখন কেবলই পোড়া কংক্রিটের হাহাকার।

স্বপ্নের অপমৃত্যু ও পনেরো বছরের সাধনা

ইরানি সংগীত জগতের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব হামিদরেজা আফারিদেহ এবং তার স্ত্রী শেইদা এবাদতদোস্ত দীর্ঘ ১৫ বছরের নিরলস পরিশ্রমে এই সংগীত শিক্ষালয়টি গড়ে তুলেছিলেন। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিল না; বরং শিশু থেকে বৃদ্ধ—প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থীর কাছে এটি ছিল এক প্রশান্তির নীড়। যুদ্ধের ডামাডোল শুরু হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তারা প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় বড় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। তবে হামলায় যা হারিয়ে গেছে, তার আর্থিক ও মানসিক মূল্য অপূরণীয়।

হামিদরেজা অত্যন্ত ব্যথিত চিত্তে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে জানিয়েছেন যে, তাদের কয়েক দশকের সঞ্চয় আর তিল তিল করে জমানো বাদ্যযন্ত্রগুলো এখন ছাইয়ের স্তূপ। আধুনিক শব্দনিয়ন্ত্রিত দেয়াল থেকে শুরু করে দুষ্প্রাপ্য ইরানি সেতার—সবই এখন ইতিহাস।

ক্ষয়ক্ষতির এক নজরে চিত্র

এই আকস্মিক হামলায় যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরানের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। নিচের সারণিতে হামলার প্রভাবে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:

বিষয় বিবরণ
প্রতিষ্ঠানের নাম হোনিয়াক মিউজিক একাডেমি (Honiak Music Academy)
অবস্থান তেহরানের পূর্বাঞ্চল, ইরান
মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫০ জন (শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত)
কর্মসংস্থান হারানো সদস্য ২৪ জন তরুণ শিক্ষক ও কর্মী
আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৪২,০০০ মার্কিন ডলার
ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্পদ সেতার, গিটার, সন্তুর এবং অত্যাধুনিক স্টুডিও সরঞ্জাম

সামরিক লক্ষ্যবস্তু বনাম সাংস্কৃতিক বিপর্যয়

ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তারা ওই ভবনের সন্নিকটে অবস্থিত কুদস ফোর্সের একটি গোয়েন্দা সদর দপ্তর লক্ষ্য করে এই বিমান হামলা চালিয়েছিল। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ওই একই ভবনে একটি প্রসূতি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং বেশ কিছু ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও ছিল। সামরিক লক্ষ্যবস্তুর দোহাই দিয়ে চালানো এই হামলায় কার্যত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড।

হামিদরেজার মতে, এই আঘাত কেবল একটি ভবনের ওপর নয়, বরং হাজার বছরের পারস্য সংস্কৃতির ওপর। শিক্ষার্থীদের কাছে এই একাডেমি ছিল তাদের ‘দ্বিতীয় বাড়ি’। যুদ্ধ যেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নেয়, সেখানে সংগীত ছিল তাদের বেঁচে থাকার রসদ। এখন সেই সুরের ঠিকানা কবে আবার পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

ভবিষ্যৎ ও অনিশ্চয়তা

ইরানের মতো প্রাচীন এবং সংস্কৃতিমনা দেশে শিল্পকলা মানুষের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হামিদরেজা আফারিদেহ আক্ষেপ করে বলেন, “ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই সুর বাঁচিয়ে রাখা আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।” এক দিকে অর্থনৈতিক মন্দা, অন্য দিকে যুদ্ধের আতঙ্ক—সব মিলিয়ে হোনিয়াক মিউজিক একাডেমির সেই সুরের মূর্ছনা আবার কবে ফিরে আসবে, তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৪ জন তরুণ শিক্ষক যারা এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা আজ বেকারত্বের অন্ধকারে নিমজ্জিত।

যুদ্ধ কেবল সীমান্ত রক্ষা বা জয়ের লড়াই নয়, এটি যখন সাধারণ মানুষের স্বপ্ন আর শিল্পের ওপর আঘাত হানে, তখন তার ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। হোনিয়াক মিউজিক একাডেমির ধ্বংসাবশেষ আজ সেই নির্মমতারই এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।