বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের খুচরা ব্যাংকিং কার্যক্রম অধিগ্রহণের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়নি।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসা বন্ধ করা অথবা অন্য কোনো ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের খুচরা কার্যক্রম নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছিল। তবে বর্তমানে এ বিষয়ে নতুন কোনো অগ্রগতি নেই।
সিটি ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, প্রায় দেড় মাস আগে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং বাজারে উভয় ব্যাংকের অবস্থান ও সুনামের কারণে তাদের সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে একটি ব্যাংকের ব্যবসার নির্দিষ্ট অংশ অন্য ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি সরল প্রক্রিয়া নয়। এ ধরনের লেনদেনে ব্যবসার মূল্য নির্ধারণ, আর্থিক ও আইনি নিরীক্ষা, সম্পদ ও দায় যাচাইসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখতে হয়। এর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনও প্রয়োজন হতে পারে। এসব কারণে বর্তমান আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এমন পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত। তবে এ নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাঁর মতে, বিদেশি ব্যাংক হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড নিজস্ব বৈশ্বিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
খুচরা ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মীদের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো পরিবর্তন হলে কর্মীদের বিষয়ে প্রচলিত নিয়ম ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। কর্মীদের আকস্মিকভাবে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে যাতে শ্রম অসন্তোষ দেখা না দেয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খুচরা ও করপোরেট ঋণে বড় পার্থক্য
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের আর্থিক বিবরণীতে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ঋণ ব্যবসায় খুচরা ও করপোরেট খাতের প্রবৃদ্ধির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।
২০২০ সালে ব্যাংকটির ভোক্তা ও এসএমই ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৮৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ছয় বছরে এ খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
অন্যদিকে একই সময়ে করপোরেট ঋণ বেড়েছে অনেক দ্রুত। ২০২০ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকায়। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ।
ফলে ব্যাংকটির ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। খুচরা ব্যাংকিংয়ের তুলনায় করপোরেট ঋণ পোর্টফোলিও সম্প্রসারণের হারও ছিল বেশি।
২০২৫ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০২৪ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। ২০২৫ সালে সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। একই সময়ে ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশে ১২০ বছরের বেশি সময়ের উপস্থিতি
বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের কার্যক্রমের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। ১৯০৫ সালে চট্টগ্রামে ব্যাংকটির প্রথম শাখা চালু হয়। বর্তমানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে ব্যাংকটির ১৮টি শাখা রয়েছে।
তবে খুচরা ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে সরে আসার সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশ থেকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পুরোপুরি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটি বাংলাদেশে করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ও ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিংয়ের কান্ট্রি হেড বিটোপি দাস চৌধুরী জানিয়েছেন, ব্যাংকটির গ্রুপ নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেলের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে। যেখানে গ্রাহকদের জন্য আরও কার্যকর সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।
এ কারণে বাংলাদেশের খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসার সম্ভাব্য মালিকানা পরিবর্তনকে ব্যাংকটির সামগ্রিক কার্যক্রম থেকে সরে যাওয়ার বদলে ব্যবসায়িক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে আরেক বিদেশি ব্যাংক এইচএসবিসিও বাংলাদেশে খুচরা ব্যাংকিং কার্যক্রম ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ওই সিদ্ধান্তের ঘোষণা আসে। এর পর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সম্ভাব্য একই ধরনের পদক্ষেপ দেশের খুচরা ব্যাংকিং বাজারে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের খুচরা ব্যবসা ব্র্যাক ব্যাংক নেবে, নাকি সিটি ব্যাংক—এখনো তা নিশ্চিত নয়। ব্যবসার মূল্যায়ন, নিরীক্ষা, সম্পদ ও দায় যাচাই, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনার ফলাফলের ওপরই সম্ভাব্য লেনদেনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।


