আর্জেন্টিনার ফুটবলে দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের আরেকটি অনন্য মাইলফলক ছুঁয়েছেন আনহেল দি মারিয়া। পেশাদার ফুটবলে এক হাজার ম্যাচ খেলার বিরল কীর্তি গড়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী এই তারকা। গত ১৩ আগস্ট রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে কোপা লিবার্তোদোরেসের শেষ ষোলোর প্রথম লেগে মাঠে নেমে তিনি ক্যারিয়ারের হাজারতম ম্যাচ পূর্ণ করেন।
ফুটবলে এত দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে খেলে যাওয়া সহজ নয়। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে চোট, ক্লাব পরিবর্তন, প্রতিযোগিতার চাপ এবং বয়সের সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যেও দি মারিয়া নিজেকে ধরে রেখেছেন। সেই ধারাবাহিকতারই স্বীকৃতি হয়ে এসেছে হাজার ম্যাচের মাইলফলক।
ফুটবলের পরিসংখ্যান সংরক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা আরএসএসএসএফের তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল, বিভিন্ন আঞ্চলিক ও অপেশাদার লিগ, বয়সভিত্তিক দল এবং বাতিল হওয়া ম্যাচসহ হিসাব করলে অন্তত এক হাজার ম্যাচ খেলা ফুটবলারের সংখ্যা ৮২। তবে কেবল শীর্ষ পর্যায়ের লিগ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কাপ প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এবং অনূর্ধ্ব-২৩ দলের ম্যাচ বিবেচনায় নিলে এই সংখ্যা নেমে আসে ৩২-এ। সেই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন দি মারিয়া।
তাঁর ম্যাচসংখ্যা নিয়েও সামান্য পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা মিলিয়ে দি মারিয়ার পেশাদার ম্যাচসংখ্যা ১০০২। তবে আরএসএসএসএফের তালিকায় এখনো একটি ম্যাচ কম দেখা যাচ্ছে। কারণ, আর্জেন্টিনার শীর্ষ লিগে তাল্লেরাসের বিপক্ষে রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে তাঁর সর্বশেষ ম্যাচটি ওই তালিকায় তখনও যুক্ত হয়নি।
আর্জেন্টিনার ফুটবলে অবশ্য দি মারিয়াই প্রথম নন, যিনি হাজার ম্যাচের সীমা অতিক্রম করেছেন। তাঁর আগে এই কীর্তি গড়েছেন দুই কিংবদন্তি—লিওনেল মেসি ও হাভিয়ের জানেত্তি।
আরএসএসএসএফের হিসাবে মেসি শীর্ষ পর্যায়ে ১১৬৮ ম্যাচ খেলেছেন। তবে আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম এল গ্রাফিকোর হিসাবে তাঁর ম্যাচসংখ্যা ১১৭০। অন্যদিকে, ইন্টার মিলানের হয়ে দীর্ঘদিন খেলেছেন এবং চ্যাম্পিয়নস লিগও জিতেছেন সাবেক ডিফেন্ডার হাভিয়ের জানেত্তি। আরএসএসএসএফের হিসাবে শীর্ষ পর্যায়ে তাঁর ম্যাচ ১০৮১টি। এল গ্রাফিকোর হিসাবে সেই সংখ্যা ১০৯৯।
দি মারিয়ার পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু রোজারিও সেন্ট্রালেই। ২০০৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার শীর্ষ লিগে ক্লাবটির হয়ে তাঁর অভিষেক হয়। এরপর ইউরোপের ফুটবলে তিনি একে একে বেনফিকা, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, প্যারিস সেন্ট জার্মেই ও জুভেন্টাসের মতো বড় ক্লাবে খেলেছেন।
ক্লাব ক্যারিয়ারে তাঁর সাফল্যের তালিকাও দীর্ঘ। পর্তুগাল, স্পেন ও ফ্রান্সে লিগ শিরোপা জেতার পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপাও জিতেছেন। আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়েও দি মারিয়ার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। জাতীয় দলের হয়ে তিনি ১৪৫ ম্যাচ খেলেছেন। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের সময়টিতে আর্জেন্টিনার সোনালি প্রজন্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। এই সময়ে দলটি কোপা আমেরিকার শিরোপা দুবার জয়ের পাশাপাশি ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপও জেতে।
বিশেষ করে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল এবং ২০২২ বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দি মারিয়ার পারফরম্যান্স তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে আরও উজ্জ্বল করেছে। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের পর আর্জেন্টিনার জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর ফিরে আসেন পেশাদার ক্যারিয়ার শুরুর ক্লাব রোজারিও সেন্ট্রালে।
৩৮ বছর বয়সেও ক্লাব ফুটবলে সক্রিয় থাকা দি মারিয়ার ক্যারিয়ারের স্থায়িত্বের আরেকটি দৃষ্টান্ত। সব মিলিয়ে তাঁর গোলসংখ্যা ২৪৩ এবং সতীর্থদের দিয়ে করানো গোল ২৮৪টি। ক্যারিয়ারে তিনি ১০টি লাল কার্ডও দেখেছেন।
এক হাজার ম্যাচের মাইলফলক তাই শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে টিকে থাকার দলিল। মেসি ও জানেত্তির পর তৃতীয় আর্জেন্টাইন হিসেবে এই তালিকায় নিজের নাম লিখিয়ে দি মারিয়া দেশের ফুটবল ইতিহাসে আরও একটি বিশেষ জায়গা করে নিলেন।



