রাজধানীর গুলশানে সাবেক এক সংসদ সদস্যের বাসায় চাঁদাবাজির ঘটনায় গ্রেপ্তার আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নে একতলা পাকা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। প্রায় আড়াই মাস আগে শুরু হওয়া এ নির্মাণে গত সপ্তাহে ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে।
রবিবার (২৭ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ভবনটিতে চারটি কক্ষ রয়েছে। ভবনটির দক্ষিণ পাশে রয়েছে তার চাচা জসিম উদ্দিনের জীর্ণ টিনশেড ঘর, আর পশ্চিম পাশে অন্য এক চাচার টিনের ঘর। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আগে সেখানে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘর ছিল, সেটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
আবদুর রাজ্জাক বর্তমানে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। গত শনিবার রাতে গুলশানে সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসা থেকে তাকে ও আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালত রাজ্জাকসহ চারজনকে সাত দিনের রিমান্ডে পাঠায়। ঘটনার পরপরই সংগঠন থেকে রাজ্জাককে বহিষ্কার করার কথা জানানো হয়।
গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যে বেড়ে ওঠা রাজ্জাকের হঠাৎ পাকা ভবন নির্মাণ ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে তার গ্রেপ্তারের ঘটনায়। যদিও রাজ্জাকের পরিবার বলছে, ভবনের অর্থায়ন হচ্ছে অনুদান, ধার-দেনা এবং এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে।
রাজ্জাকের মা রেজিয়া বেগম বলেন, তার ছোট ছেলে রাজ্জাক ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, বড় ছেলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। ভবন নির্মাণের অর্থ জোগাড় করা হয়েছে স্বামীর জমানো টাকা, মানুষের সহায়তা এবং একটি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে। তিনি দাবি করেন, ছেলের কাছ থেকে কোনো অর্থ আসেনি, বরং তাকেই প্রতি মাসে ছেলেকে টাকা পাঠাতে হয়।
এ বিষয়ে রাজ্জাকের এক চাচি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজ্জাকের বাবা ও বড় ভাই আগে রিকশা চালাতেন। দুই-আড়াই মাস আগে তিনি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। পরিবারের দাবি, গত বছরের বন্যায় আগের ঘরটি পুরোপুরি ভেঙে যায়। তখন সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ঢেউটিন বিক্রি করে কিছু টাকা এবং আল-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া ৫০ হাজার টাকাও ভবনের কাজে ব্যয় করা হয়েছে। তবে ঋণের কাগজপত্র দেখাতে পারেননি রেজিয়া বেগম।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাজ্জাকের অর্থনৈতিক অবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন তাদের বিস্মিত করেছে। এলাকার বাসিন্দা জোবায়ের হোসেন বলেন, রাজ্জাক ঢাকার প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। সে আগে ভদ্র স্বভাবের ছাত্র হিসেবেই পরিচিত ছিল। তবে ৫ আগস্টের পর তার ‘সমন্বয়কের’ দায়িত্ব পাওয়া ও এরপর হঠাৎ ভবন নির্মাণ এলাকায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
আরেক বাসিন্দা, সৌদি প্রবাসী সোহেল বলেন, “রাজ্জাক এখন নাকি কোটিপতি! বাড়িতে ভবন নির্মাণ করছে, দামি বাইক কিনেছে—এসব খবর শুনছি।” স্থানীয় রবিউল ইসলাম বলেন, “একজন ছাত্র কীভাবে এত টাকার মালিক হয়? এখন আবার চাঁদাবাজির মামলায় ধরা পড়েছে। আমরা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই।”
একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভবনের আয়তন আনুমানিক ৯০০–১,০০০ বর্গফুট, আর এই পর্যন্ত ছাদ ঢালাইসহ যা কাজ হয়েছে, তাতে খরচ হয়েছে প্রায় ১২–১৫ লাখ টাকা।
উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের উদ্যোগে গঠিত গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদে রাজ্জাক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হন তিনি। গুলশানের ঘটনায় রাজ্জাক ছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন মুন্না, সদস্য সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাবকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনার পর গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া সারা দেশের সব কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
খবরওয়ালা/টিএসএন



