খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ভূমিকা রাখছে। প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনার সাথে ক্ষমতা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত বলে মন্তব্য করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তাঁর মতে, একজন ধর্ষক হয় অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী, না হয় সামাজিকভাবে শক্তিশালী। এর বাইরে সে হয় রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী অথবা সমাজব্যবস্থার কারণে কেবল নিজের লৈঙ্গিক পরিচয়ের ফলেই নিজেকে নারীর চেয়ে শক্তিশালী মনে করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সমাজে একটা মেয়ের দিকে যত দ্রুত এবং সহজে কোনো প্রকার সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই আঙুল তোলা যায়, একটা ছেলের দিকে অপরাধের আঙুল ততটা সহজে ওঠে না।
২০২৬ সালের ৪ জুন (বৃহস্পতিবার) বিকেলে রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে ‘আর না ধর্ষণ, শিশু নিপীড়ন, বিচারহীনতা: কোন পথে সমাধান?’ শীর্ষক একটি বিশেষ গোলটেবিল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন বিরোধী নাগরিক উদ্যোগ ‘আর না+’ নামক একটি সংগঠন এই সচেতনতামূলক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। উক্ত আলোচনা সভায় উপস্থিত থেকে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা নারী ও শিশু নির্যাতনের বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং এর সমাধানের উপায় নিয়ে বিশদ বক্তব্য প্রদান করেন।
গোলটেবিল আলোচনায় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে বর্তমানে বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সুনির্দিষ্ট তথ্যের সূত্র উল্লেখ করে তিনি জানান, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশে ১১৮টিরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে অধিকাংশ অপরাধেরই শিকার হয়েছে কোমলমতি শিশুরা। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, সমাজে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা সমানভাবে গুরুত্ব পায় না। কোনো কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা সামাজিক বা রাজনৈতিক কারণে অতিরিক্ত আলোচিত হয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, যার ফলে অন্যান্য অসংখ্য অপরাধের ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।
এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, ঢাকার পল্লবীতে সংঘটিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে ব্যাপক তৎপরতা ও সংবেদনশীলতা লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু একই সময়কালে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ঘটে যাওয়া অনেক শিশুর প্রতি রাষ্ট্র বা সমাজ থেকে একই ধরনের মনোযোগ কিংবা সংবেদনশীলতা দেখা যায়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিচার পাওয়ার জন্য কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হওয়া কিংবা রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হওয়া মোটেও উচিত নয়। দেশে আইনের শাসন সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি অপরাধের ঘটনা এবং সব ভুক্তভোগীকেই সমান গুরুত্ব ও আইনি সহায়তা দিতে হবে।
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার মতে, সমাজ থেকে ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে হলে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর সেগুলো হলো—যথাযথ শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং সময়োপযোগী বিচার। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় বয়ঃসন্ধিকাল, মানুষের শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন ও যৌনতা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা যথাযথভাবে দেওয়া হয় না। বিশেষ করে কিশোর বা ছেলেরা অনেক সময় সঠিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের অভাবে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যৌন শিক্ষা নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো গভীর সামাজিক ‘ট্যাবু’ বা নিষেধাজ্ঞা ও অনীহা রয়েছে, যা ভাঙতে পরিবার ও গণমাধ্যমকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
এই সংসদ সদস্য আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, প্রতিটি পরিবারে ছেলে ও মেয়ে উভয় সন্তানকেই ছোটবেলা থেকে এই শিক্ষা দিতে হবে যে—যৌন হয়রানি, নিপীড়ন বা ধর্ষণের সম্পূর্ণ দায় কেবল অপরাধীর, এর পেছনে ভুক্তভোগীর কোনো দায় থাকে না। ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করার পাশাপাশি তাদের মনে এই মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে যে, যৌন সহিংসতা অন্য যেকোনো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের মতোই একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সমাজে নারীদের সহজেই দোষারোপ করার যে নেতিবাচক প্রবণতা রয়েছে, তা মূলত ধর্ষকদের আরও বেশি সাহস জোগায়। তাই একজন নারী কী পোশাক পরেছেন, কোথায় গেছেন বা কার সাথে ছিলেন—তা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে, প্রশ্ন তোলা উচিত অপরাধী কেন এবং কার জোরে এই অপরাধটি করল।
মাদ্রাসাকেন্দ্রিক যৌন নির্যাতনের প্রসঙ্গে রুমিন ফারহানা বলেন, আমাদের সমাজ মাদ্রাসাকে নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষার একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করে। দরিদ্র ও সামাজিক প্রান্তিক পরিবারের অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ আস্থা নিয়ে সেখানে পাঠান। সেই আস্থার জায়গায় যদি শিশু নির্যাতন বা বলাৎকারের ঘটনা ঘটে, তবে তা শুধু একটি সাধারণ অপরাধ নয়, বরং বিশ্বাসভঙ্গেরও একটি ভয়াবহ উদাহরণ। আর এ কারণেই এসব ঘটনা নিয়ে সমাজে বাড়তি উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা বলেন, ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো কেবল তখনই সমাজে আলোচনায় আসে, যখন তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় বা সামাজিকভাবে বড় ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী জবাবদিহি ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বা মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
ডা. তাসনিম জারা আরও বলেন, বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি পুলিশ, আধুনিক ফরেনসিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থার কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি না করা হলে কেবল কঠোর আইন দিয়ে অপরাধ দমন কার্যকর করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে মামলার ক্ষেত্রে ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ ও দক্ষ জনবলের যে দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়েছে, তা বিচার প্রক্রিয়ার একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। এই সমস্যা সমাধানে তিনি একটি কেন্দ্রীয় ‘ডি ডিজিটাল ট্র্যাকিং’ বা ‘ড্যাশবোর্ড’ চালুর প্রস্তাব দেন। এর মাধ্যমে প্রতিটি ধর্ষণ ও নির্যাতন মামলার দৈনিক অগ্রগতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। কোন মামলা কত দিনে নিষ্পত্তি হলো এবং কোথায় বিলম্ব হলো—এসব তথ্য ট্র্যাক করা হলে প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।
উক্ত গোলটেবিল আলোচনা সভায় আরও অংশ নিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাংবাদিক মানজুর আল মতিন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের মহাসচিব সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘গণবিপ্লবী উদ্যোগ’-এর প্রতিনিধি আরিফ সোহেল, ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ (এনপিএ)-এর মুখপাত্র নাজিফা জান্নাত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেত্রী উমামা ফাতেমা এবং ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক পার্টি’ (জেডিপি)-এর আহ্বায়ক নাঈম আহমাদসহ প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ।