খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 8শে আশ্বিন ১৪৩২ | ২৩ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পান্টি গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল করিম কক্সবাজারের টেকনাফে বেড়াতে এসে অপহরণের শিকার হন। তাকে স্থানীয় হোটেল আল করমের সাবেক ম্যানেজার মো. আমিন অপহরণ করে মানব পাচারকারীদের কাছে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। পাচারকারীরা তাকে টেকনাফের বাহারছড়া কচ্ছপিয়া এলাকার গহীন পাহাড়ের একটি আস্তানায় আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন চালায়।
রেজাউলের ভাষ্যমতে, ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় টেকনাফ পৌর শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের ঝরনা চত্বর থেকে হঠাৎ কয়েকজন তাকে অপহরণ করে চোখ বেঁধে ফেলে। তিনি বলেন, ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম আমি অপহৃত হয়েছি। চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে পাহাড়ি আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে মানব পাচারকারীদের কাছে আমাকে হস্তান্তর করে অপহরণকারীরা। এরপর ওই আস্তানায় আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য আমার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। টানা ১৩ দিন ধরে এই নির্যাতন চলে। সর্বশেষ গত শনিবার আমাকে ৬০ হাজার টাকায় আরেকটি পাচারকারী দলের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তারা আমাকে কচ্ছপিয়ার গহীন পাহাড় থেকে অন্য একটি পাহাড়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমি দৌড়ে পালিয়ে পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে আসি। এভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলাম।’ জীবন বাঁচাতে তিনি বিজিবির কাছে ছুটে যান এবং বিজিবি তাকে নিরাপদে তাদের হেফাজতে নেয়।
রেজাউলের তথ্যে ৮৩ জনের জীবন রক্ষা
রেজাউল শুধু একা ফেরেননি, তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও ৮৩ জনের জীবন রক্ষা পেয়েছে। গত রবিবার বিজিবি ও র্যাব কচ্ছপিয়ার গহীন পাহাড়ে যৌথ অভিযান চালিয়ে নারী ও শিশুসহ আরও ৮৩ জনকে উদ্ধার করেছে। এই উদ্ধারকৃতদের সাগরপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচারের জন্য আস্তানাটিতে জড়ো করা হয়েছিল। একই সাথে অস্ত্র-গুলিসহ তিন মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৮৩ জনকে উদ্ধারের বিষয়ে সোমবার দুপুরে টেকনাফ ২ বিজিবির সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান এবং র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসান অভিযানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এ সময় বিজিবি কার্যালয়ে উপস্থিত এই প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় রেজাউল করিমের। তিনি তার বেঁচে ফেরার বিস্তারিত বর্ণনা দেন।
পাহাড়ের আস্তানার বিবরণ দিয়ে রেজাউল করিম বলেন, ‘যখন আস্তানায় আমার চোখ খুলে দেওয়া হলো, তখন দেখলাম চারপাশে দুই শতাধিক মানুষ বন্দি। তারা পাহাড়ে একটি অন্ধকার সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। যেখানে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই, দাম আছে শুধু টাকার। সন্ধ্যা নামলেই আমার ওপর নির্যাতন শুরু হতো। পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণের জন্য পাচারকারীরা আমাকে নির্যাতন করত। একইভাবে অন্যদের ওপরও নির্যাতন চালানো হতো। একপর্যায়ে অপহৃতদের পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলিয়ে অথবা নির্যাতনের শব্দ শুনিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হতো। মুক্তিপণ না পেলে মানব পাচারকারীদের কাছে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হতো। আমি যেদিন পালিয়ে আসি সেদিনও তাদের আস্তানায় প্রায় ২৫০ জন মানুষ ছিল। পরে আমার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিজিবি ও র্যাব অভিযান চালায়। সেই আস্তানা থেকে ৮৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে জানতে পেরেছি হোটেল আল করমের ম্যানেজার আমিন আমাকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। প্রতিনিয়ত এখানে আসা লোকজনকে অপহরণ করা হয়। এখনও ওই আস্তানায় শতাধিক মানুষ বন্দি আছে। তাদেরও উদ্ধার করা জরুরি। তা না হলে তাদের ভাগ্যে কী ঘটবে, তা বলা কঠিন।’
হোটেল আল করমের মালিকের বক্তব্য
ম্যানেজার অপহরণের সঙ্গে জড়িত এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হোটেল আল করমের মালিক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এটি আমাদের পারিবারিক হোটেল। ১০ বছরের জন্য অন্যদের কাছে এটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে। যারা এখন হোটেল পরিচালনা করছেন, তারা আমিনের বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ম্যানেজার আমিনকে দুই বছর আগেই হোটেল থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। সে বর্তমানে আমাদের হোটেলের কেউ নয়।’
একই আস্তানা থেকে টেকনাফের নয়াপাড়ার বাসিন্দা আয়েশা খাতুনকে উদ্ধার করা হয়। তিনি গত সপ্তাহে এক পরিচিত নারীর সঙ্গে পাহাড়ে ঘুরতে এসে অপহরণের শিকার হন। আয়েশা বলেন, ‘টেকনাফ থেকে আমাকে ঘোরার সময় অপহরণ করা হয়েছিল। পরে মানব পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। তারা আমাকে পাহাড়ের আস্তানায় আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন চালায়। এখানে আরও অনেক মানুষকে বন্দি অবস্থায় দেখেছিলাম। একটি ঝুপড়ি ঘরে আমাদের গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল। অনেক কষ্ট ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ছয় দিন কাটিয়েছি। অবশেষে বিজিবির অভিযানে আমরা উদ্ধার হয়েছি। যদি উদ্ধার না হতাম, হয়তো মৃত্যুর মুখে পড়তাম। আসলে এখান থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই।’
তাদের মতো মুন্সীগঞ্জ সদরের অমিত হাসান ও মানিক মিয়াও অপহরণের শিকার হন। মুন্সীগঞ্জে তাদের সঙ্গে কক্সবাজারের এক বাসিন্দার পরিচয় হয়। তারই আমন্ত্রণে তারা দুজন কক্সবাজার বেড়াতে আসেন। টেকনাফে ভ্রমণের কথা বলে ওই বাসিন্দা অমিত ও মানিককে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। এরপর পাচারকারীরা সাগরপথে থাইল্যান্ডে পাচারের জন্য দুজনকে টেকনাফের পাহাড়ের ভেতরের একটি আস্তানায় আটকে রাখেন। ২০ দিন পর র্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানে তারা উদ্ধার হন।
বিজিবি-র্যাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া ৮৪ জনের মধ্যে রেজাউল করিম, আয়েশা খাতুন, অমিত হাসান ও মানিক মিয়াকে জোর করে পাচারকারীদের ওই আস্তানায় নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। অন্যদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে আস্তানাটিতে নিয়ে আসা হয়। এদের মধ্যে অনেককে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ডে উন্নত জীবন ও চাকরির লোভ দেখানো হয়েছে। কয়েকজন নারীকে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে আনা হয়েছিল। উদ্ধার করা ৮৪ জনের মধ্যে ৬৬ জনই রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা। রেজাউল করিম সেখান থেকে পালিয়ে এসে বিজিবিকে তথ্য দেন। পরে সেখানে অভিযান চালানো হয়।
সাগরপথে মালয়েশিয়া নেওয়ার কথা বলে পাচার
অভিযানে উদ্ধার হওয়া উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ এনাম (২২) এবং আমিন বাহার (২৪) জানান, তারা ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা জানান, ক্যাম্পের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আট বছর পার হলেও তাদের দেশে ফেরার কোনো সমাধান হচ্ছে না। পাশাপাশি সম্প্রতি ক্যাম্পে অপহরণের ঘটনাও বেড়েছে। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে কয়েকজনের সঙ্গে মিলে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে পড়েন। তাদের বলা হয়েছিল, উন্নত জীবন এবং মালয়েশিয়ায় চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু পাহাড়ের আস্তানায় এনে মানব পাচারকারীরা তাদেরও বিক্রি করে দিয়েছে। এরপর আস্তানায় আটকে রেখে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়।
মোহাম্মদ এনাম বলেন, ‘ক্যাম্পের পরিচিত এক দালালের মাধ্যমে আমরা টেকনাফে পৌঁছাই। এরপর আমাদের পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরও অনেক মানুষ বন্দি ছিল। কথা ছিল, মালয়েশিয়া পৌঁছালে দুজন মিলে ছয় লাখ টাকা দিতে হবে। কিন্তু দালাল আমাদের পাঠানোর কথা বলে পাহাড়ে ১০ দিন আটকে রাখে। পরে মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা না পাওয়ায় আমাদের মারধর করা হয়। যারা মুক্তিপণ দেয়, তাদের আলাদা করে রাখা হয়।’
১২ ঘণ্টা ধরে পাহাড়ে অভিযান
টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান জানিয়েছেন, পাহাড়ের ওই আস্তানায় অভিযান শুরুর পর পাচারকারীরা যৌথ বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে তিনটি গুলি ছোড়ে। এ সময় তারা কিছু ভুক্তভোগীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। তবে পুরো পাহাড় ঘিরে ফেলে কৌশলে সব ভুক্তভোগীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়। প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে এই অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় অস্ত্র-গুলিসহ তিন মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিন মানব পাচারকারী গ্রেপ্তার
গ্রেপ্তার হওয়া তিন মানব পাচারকারী হলো—টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া এলাকার সালামত উল্লাহর ছেলে আবদুল্লাহ (২১), রাজরছড়ার আবুল হোসেনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২০), একই এলাকার মো. ফিরোজের ছেলে মো. ইব্রাহিম (২০)। তাদের কাছ থেকে একটি ওয়ান শুটার গান, একটি একনলা বন্দুক, একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশি রামদা, একটি চাকু এবং তিনটি তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলা হয়েছে। সোমবার বিকেলে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
সক্রিয় কয়েকটি মানব পাচারকারী গ্রুপ
বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘টেকনাফের পাহাড়ে কয়েকটি মানব পাচারকারী গ্রুপ সক্রিয় হয়েছে। তাই আমরা নজরদারির মাধ্যমে পাহাড়ে অভিযান পরিচালনা করছি। বাংলাদেশে অবস্থানরত হোসেন, সাইফুল ও নিজাম নামে তিনজন আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের মূলহোতা। তাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত দালালদের একটি শক্তিশালী চক্র রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কয়েকটি চক্রও পাচারের সঙ্গে জড়িত। তাদের ধরতে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি পাহাড়ে বিভিন্ন আস্তানায় আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
এক সপ্তাহে ১৭৭ জনকে উদ্ধার
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে নদী ও পাহাড়ের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রাখা ১৭৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১২ জন মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অভিযান এখনও চলছে।
খবরওয়ালা/টিএসএন