খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের অন্যতম উজ্জ্বল ও সাহসী ছাত্রনেতা ছিলেন শফি আহমেদ। রাজপথের আন্দোলন, গণতন্ত্রের সংগ্রাম এবং প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে তাঁর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি ছিলেন সর্বদলীয় ছাত্রসমাজের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য একজন নেতা। অনেকেই তাঁকে সেই আন্দোলনের শীর্ষ সংগঠক বলে আখ্যায়িত করতেন। আন্দোলনের নানা কৌশল, পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
গণআন্দোলনের এক বেদনাবিধুর মুহূর্তে শহীদ রাউফুন বসুনিয়া গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় মিছিলের ভেতরে তাঁর হাত ধরে ছিলেন শফি আহমেদ। সেই দৃশ্য ইতিহাসের এক মর্মস্পর্শী সাক্ষ্য হয়ে আছে।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোনা জেলার মুক্তারপাড়ায় ১৯৬১ সালের ৮ অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম এডভোকেট এটিএম আজিজুল হক। এক ভাই ও ছয় বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা শফি আহমেদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবেশে।
তিনি নেত্রকোণা আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং নেত্রকোণা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনশাস্ত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন কৃতিত্বের সঙ্গে।
জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ‘নেত্রকোণা মধুমাছি কচি-কাঁচার মেলা’র মাধ্যমে তাঁর সাংগঠনিক জীবনের সূচনা ঘটে। অল্প বয়সেই নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন তিনি।
তৎকালীন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবে শফি আহমেদ ছিলেন জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা ও গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে ছাত্ররাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম-এর নেতৃত্বে গঠিত জনতার আদালতের কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তিনি শুরু থেকেই সম্পৃক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি ছিলেন দৃঢ় কণ্ঠস্বর।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলোতে শেখ হাসিনা-র সঙ্গে তাঁর ছিল আন্তরিক ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কর্মদক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতার কারণে তিনি জাতীয় রাজনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, নীতিনির্ধারণী আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অংশীদার হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন স্নেহশীল স্বামী ও দায়িত্বশীল পিতা। তাঁর সহধর্মিণী তাহেরা খোন্দকার। দুই পুত্র আফসিন আহমেদ ও আলদিন আহমেদকে রেখে তিনি পরপারে পাড়ি জমান।
২০২৪ সালের ৩ জুন সন্ধ্যায় শফি আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর সংগ্রামী জীবন, গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার, সহযোদ্ধাদের প্রতি আন্তরিকতা এবং রাজপথের স্মরণীয় ভূমিকা তাঁকে মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি রাজপথের সেই অকুতোভয় যোদ্ধাকে। তাঁর স্মৃতি ও আদর্শ আগামী প্রজন্মের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকুক।
বিনম্র শ্রদ্ধা।