খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
বিকেলের সোনাঝরা আলো যখন ক্রমশ ম্লান হয়ে আসে এবং পশ্চিম দিগন্তে সূর্য ডোবার প্রস্তুতি নেয়, তখন মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারে এক অপরূপ ও ব্যস্ততম দৃশ্যের অবতারণা হয়। চারদিকে যত দূর চোখ যায়, কেবলই থৈথৈ বিস্তীর্ণ জলরাশি, যার বুকে ভেসে বেড়ায় সবুজ ঘাস আর নানা জাতের জলজ উদ্ভিদের দল। এই শান্ত পানির বুক চিরে ছোট ছোট মাছ ধরার নৌকাগুলো সারিবদ্ধভাবে তীরের ঘাটের দিকে ছুটে আসতে শুরু করে। দিনভর হাওরের প্রতিকূল পরিবেশে কঠোর পরিশ্রমের পর, জালে ধরা পড়া হরেক রকমের দেশীয় ছোট মাছ নিয়ে মৎস্যজীবীরা এই ঘাটে এসে সমবেত হন। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের খইশাউড়া গ্রামের কাছে প্রতি রবিবার বিকেলে এই ঐতিহ্যবাহী মাছের বাজারটি বসে।
এই নির্দিষ্ট স্থানটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে অত্যন্ত পরিচিত এবং এটি ভৌগোলিক কারণে ভিন্ন ভিন্ন নামে সমাদৃত। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ও একাটুনা—এই দুটি ইউনিয়ন দুই দিক থেকে এসে ঠিক এই খইশাউড়া গ্রামে মিলিত হয়েছে। এই মিলনস্থলের গা ঘেঁষে অবস্থান করছে তিনটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম, যথা—করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়া। স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের নিজস্ব সুবিধা ও পছন্দ অনুযায়ী এই তিন গ্রামের যেকোনো একটির নাম ব্যবহার করে এই বাজারের স্থানটিকে চিহ্নিত করে থাকেন।
পড়ন্ত বিকেলে গ্রামের ইট-সুরকি বিছানো আঁকাবাঁকা পথ ও কাদামাটির রাস্তায় যখন বাড়িঘরের দীর্ঘ ছায়া পড়ে, তখন করমউল্লাহপুর গ্রামের একটি কালভার্টের ওপর নানাবয়সী মানুষের ঢল নামে। গ্রীষ্মের তীব্র গরমের মাঝে কাউয়াদীঘি হাওরের দিক থেকে আসা মৃদু বাতাস উপভোগ করার জন্য অনেকেই এই কালভার্টের রেলিংয়ে বসেন বা দাঁড়িয়ে থাকেন। তবে এই কালভার্টটি কেবল সাধারণ মানুষের হাওয়া খাওয়ার স্থান নয়, এটি মূলত হাওরের তরতাজা ছোট মাছ কেনাবেচার একটি অত্যন্ত সুপরিচিত পাইকারি কেন্দ্র।
জেলেরা হাওর থেকে মাছ ধরে সরাসরি এই কালভার্টের সমীপবর্তী বাজারে নিয়ে আসেন। কেউ মাছের বিশেষ পাত্র বা ডোলা কাঁধে ঝুলিয়ে আসেন, আবার কেউ মাছ বিক্রি শেষ করে হাসিমুখে বাড়ির দিকে রওনা হন। এখানে মাছের আগমন এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। আর সেই সংগৃহীত মাছ কেনার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারি ক্রেতারা বিক্রেতাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। দরদাম চূড়ান্ত হওয়ার পর পাইকারেরা মাছ কিনে বড় প্লাস্টিকের ক্যারেট এবং বেতের বিশেষ ঝুড়িতে অত্যন্ত যত্নসহকারে জমা করতে থাকেন।
করমউল্লাহপুর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা রেনু মিয়া ও দুরুদ মিয়ার প্রদত্ত বিবরণ অনুযায়ী, এই বাজারটি সম্পূর্ণভাবে একবেলার পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচালিত হয়। বিকেল চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই বেচাকেনা শেষ হয়ে বাজারটি ভেঙে যায়। এই অল্প সময়ের মধ্যে হাওরে যাওয়া প্রায় সকল জেলেই মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরে আসেন। এখানকার ক্রেতা ও বিক্রেতাদের প্রায় সবাই করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়া—এই তিন গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা। এই হাট থেকে কেনা মাছগুলো পরবর্তীতে খুচরা বিক্রেতারা মৌলভীবাজার শহরের টিসি মার্কেট এবং পশ্চিম বাজারে নিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন।
কাউয়াদীঘি হাওরের এই অস্থায়ী বাজারে মূলত দেশীয় প্রজাতির হরেক রকমের ছোট মাছের বিপুল সরবরাহ দেখা যায়। বাজারে নিয়মিত পাওয়া যায় এমন প্রধান প্রধান মাছের তালিকা এবং মৎস্যজীবীদের কর্মযজ্ঞের বিবরণ নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বাজারে প্রাপ্ত মাছের প্রজাতিসমূহ | মৎস্যজীবীদের দৈনিক কর্মতালিকা | প্রতিদিন চলাচলকারী নৌকার সংখ্যা | প্রধান বিক্রয়কেন্দ্রসমূহ |
| মলা, পুঁটি, ট্যাংরা, কই, মেনি, খইয়া, চ্যাং, চাঁদাসহ বিভিন্ন দেশীয় ছোট মাছ। |
প্রথম দফা: দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফা: শেষ রাত ৩টা থেকে সকাল পর্যন্ত। |
করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়া গ্রাম থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি নৌকা হাওরে যায়। | মৌলভীবাজার শহরের টিসি মার্কেট এবং পশ্চিম বাজার। |
হাওর থেকে মাছ ধরে ঘাটে ফেরার পথে খইশাউড়া গ্রামের মোশারফ মিয়ার সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি দুপুর দুইটার দিকে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে হাওরে যান এবং বিকেল ছয়টার মধ্যে মাছ ধরে বাজারে ফিরে আসেন। তাঁর কাঁধের ঝুড়িতে থাকা মলাসহ বিভিন্ন জাতের তরতাজা মাছের আনুমানিক বাজারমূল্য পাঁচ-ছয় শ টাকা। তিনি বছরের প্রায় প্রতিটি দিনই এই নির্দিষ্ট সময়ে হাওরে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
একই গ্রামের আরেকজন তরুণ মৎস্যজীবী তানজিল হাসান নৌকার পাটাতন থেকে পানি ও তরতাজা মাছগুলো প্লাস্টিকের ক্যারেটে তুলতে তুলতে জানান, তিনি এবং তাঁর সহযোগী দুপুর দুইটার পর পাতা জাল নিয়ে হাওরে গিয়েছিলেন। তাঁদের সংগৃহীত মাছের মূল্যও প্রায় পাঁচ থেকে সাত শ টাকা। এই মাছ কালভার্টের বাজারে বিক্রি শেষ করে, তাঁরা আবার শেষ রাত তিনটার দিকে দ্বিতীয় দফায় নৌকা নিয়ে মাছ ধরার জন্য হাওরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
স্থানীয় প্রবীণদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এই অঞ্চলের তিনটি গ্রামের একটি বিশাল অংশের মানুষের প্রধান জীবিকা হলো মৎস্য শিকার। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন কাউয়াদীঘি হাওর পানিতে পরিপূর্ণ থাকে, তখন তাঁদের ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতিটি নৌকায় সাধারণত একজন বা দুজন করে মৎস্যজীবী থাকেন। কেউ বিকেলে মাছ ধরেন, আবার কেউ সন্ধ্যার সময় হাওরের নির্দিষ্ট স্থানে ছোট মাছ ধরার জাল পেতে রেখে আসেন এবং শেষ রাতে গিয়ে সেই মাছ সংগ্রহ করেন। হাওরে যতদিন পানি থাকে, এই অঞ্চলের মানুষের মাছ ধরা ও বিক্রির এই চিরচেনা জীবনচক্রটি একটি নিয়মের মতো অবিরত চলতে থাকে। শেষবেলায় যখন সন্ধ্যার ছায়া ঘন হয়ে আসে, তখন বেচাকেনা শেষ করে খুচরা বিক্রেতারা শহরের বাজারের দিকে রওনা হন এবং হাওরপার আবার শান্ত রূপ ধারণ করে।