খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫
শুভ জন্মদিন তিমির নন্দী—কণ্ঠসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কিংবদন্তি শিল্পী
আজ ১৫ নভেম্বর, বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম—বীর মুক্তিযোদ্ধা, কণ্ঠসৈনিক ও কিংবদন্তি শিল্পী তিমির নন্দীর শুভ জন্মদিন। তাঁর জীবনযাত্রা একেবারে অনন্য—সংগীতের অঙ্গন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, সাংস্কৃতিক জাগরণ থেকে শিক্ষকতা—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন এক অগ্রণী নেতা।
বয়স মাত্র সাড়ে তিন বছর—তবে কোনো ওস্তাদ ছাড়াই তবলা বাজিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন তিমির নন্দী। তাঁর পরিবার ছিল সংগীতপ্রেমী, আর সেই পরিবেশেই বেড়ে উঠেন তিনি। মা রানু নন্দী ছিলেন সংগীতজ্ঞ, বোনেরা গান ও নাচে পারদর্শী। বাবার সরকারি চাকরির কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেড়ানোর সুযোগ পেয়ে জীবনবোধ আরও গভীর হয় তাঁর।
তিমিরের সংগীতের পথচলা শুরু হয় ক্লাস থ্রি-তে বেঞ্জো বাজানোর মাধ্যমে। ষাটের দশকে নিজের গলায় ঝুলিয়ে নেন সোনালী মেডেল—এতেই প্রমাণিত হয় শৈশবে তাঁর সংগীত প্রতিভা। এক অনুষ্ঠানে নজরুলসংগীত “কাবেরী নদী জলে গো কে গো বালিকা” গাওয়ার পর, সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ তাঁর কণ্ঠের প্রশংসা করেন এবং মঞ্চে এসে তাকে কোলে তুলে নেন। এ ঘটনা ছিল তিমিরের শিল্পীজীবনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত।
রাজশাহীতে ওস্তাদ হরিপদ দাসের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন তিমির নন্দী। ১৯৬৯ সালে শুরু হয় তাঁর বেতার ও টেলিভিশন যাত্রা। সেখানে তাঁর গানের স্বীকৃতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সংগীত প্রতিযোগিতায় ঢাকা বিভাগে প্রথম ও আধুনিক গানে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করার পর, তিনি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইষ্ট পাকিস্তান মিউজিক কম্পিটিশনে আধুনিক গানে প্রথম এবং পল্লীগীতিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।
তাঁর গানগুলি পত্রিকা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রশংসিত হয়। একদিন, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি বয়েজ হাই স্কুল তাঁকে বিশেষ সম্মান জানাতে একদিনের ছুটি ঘোষণা করে। সেই সময় রেডিও পাকিস্তান ও পিটিভি প্রযোজকরা তিমির নন্দীকে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানায়—এভাবে শুরু হয় তাঁর ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দীর্ঘ সফর।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চলে তিনি গান গেয়ে মুক্তির স্পৃহা ছড়িয়ে দেন। যদিও তিনি যুদ্ধের ময়দানে অংশ নিতে চেয়েছিলেন, মায়ের অনুরোধে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন এবং গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেন।
শরণার্থী শিল্পী হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন ক্যাম্পে গান, নাচ ও নাটকে অংশ নেন। এই পরিবেশনাগুলির মাধ্যমে তিনি সংগ্রাম ও সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দেন, আর আয়-রোজগার থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে অর্থ দান করেন। যুদ্ধকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁর শৈশবের মেডেল-ট্রফি লুট করে নিলেও, তিমির নন্দীর মনোবল কখনোই ভেঙে যায়নি।
মুক্তিযুদ্ধের পর, ১৯৭২ সালে আবারও সংগীতচর্চা শুরু করেন তিমির নন্দী। তিনি একে একে নজরুলসংগীত, গণসংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীতে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন বিভিন্ন শিল্পী ও উস্তাদের কাছে। সংগীত পরিচালনা ও শিক্ষকতাতেও তিনি ছিলেন অবিস্মরণীয়। আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে স্বরলিপি তৈরি ও তা শিক্ষার্থীদের শেখানোর কাজেও তিনি এক অনন্য ভূমিকা রাখেন।
২০২৩ সালে তিমির নন্দী পেয়েছেন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর সম্মানিত “ঋষিজ পদক”—এটি ছিল তাঁর সংগীতজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
আজ, ১৫ নভেম্বর, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং কিংবদন্তি শিল্পী তিমির নন্দীর জন্মদিন। আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই এবং তাঁর দীর্ঘ জীবন, সুস্থতা ও সৃষ্টিশীলতার জন্য প্রার্থনা করি।
শুভ জন্মদিন, কণ্ঠসৈনিক তিমির নন্দী!
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।